March 23, 2019     Select Language
Editor Choice Bengali KT Popular শিল্প ও সাহিত্য

চম্বল : মাধো সিং, শুধু বাগি নয়, মাজিকেও কেয়াবাৎ (পর্ব-৬)

1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (No Ratings Yet)
Loading...

বেহড় ছেড়ে মাধো সিং ম্যাজিক শিখেছিলেন কলকাতার ‘সরকার\’স্যারের কাছে। … পড়তে থাকুন  ‘চম্বল কাহিনী’

সৌগত রায় বর্মন 

মাংকিক্যাপের কথা উঠলেই বাঙালির লালমোহনবাবুর কথা মনে পড়ে যায়। তাঁর কথা ভাবা মানেই মনের কোনায় কোথায় যেন একটা হাসির ফোয়ারা উথলে ওঠা। কিন্তু আমাদের কাছে মাংকিক্যাপ মোটেই হাসির খোরাক নয়। বরং জীবনদায়িনি। ডিসেম্বরের শীতে স্রেফ ওই বাঁদর টুপির জন্যই বেহড়ে খোলা আকাশের নীচে রাত কাটানোর পর আজও বেঁচে আছি।

বেলগাড়িতে রছেড়ে পৌঁছে ২ দিন আমাদের কেউ খাটিয়া থেকে নামতে দেয়নি। ঘন্টায় ঘন্টায় গরম ফেনা ওঠা দুধ খেয়ে, কাচা গোঁফ সাদা করে, আমাদের তখন দাস্ত হবার উপক্রম। আমাদের সঙ্গে ডাস্ট কফি ছিল। ঠিক করলাম দুধে মিশিয়ে খাবো।  আশ্চর্য ব্যপার!. তাই খেয়ে দ্রুত সুস্থও হয়ে ঊঠলাম।

কিন্তু এ ভাবে বিশ্রাম করলে তো চলবে না। এখনও বিস্তর কাজ পড়ে আছে। আগেই বলা হয়েছে, তলে তলে যে কাজ চলছে তা আমরা ঠিক বুঝতে পারছিলাম। তৃতীয় দিনে খবর পেলাম। ভিন্দ শহরে একদা বাগী মাধো সিং এর তাঁবু পড়েছে। তিনি এক সময়ে খুঁখার ডাকু ছিলেন। 

Image result for chambal dacoit and magician madho singh

মান সিং এর পর যে দুজন ডাকুর নাম সব চাইতে লাইম লাইটে এসেছিল, তাদের একজন, মাধো সিং, আন্যজন মোহর সিং। দ্বিতীয় জনের সঙ্গে আমাদের সেই যাত্রায় দেখা হয়নি। হয়েছিল পরের বার। ৮৩ সালে, যখন চম্বল সুন্দরী(!)  ফুলন দেবী এক বন্দুকের হত্যায় বিশ্ব রেকর্ড করে ফেলেছে। সে অন্য অধ্যায়।

আপাতত এখন আমরা মোস্ট ক্যারিস্ম্যাটিক ডাকু ওরফে বাগী মোহর সিংকে নিয়ে একটু আলোচনা করি।

পৌঁছে গেলাম এটওয়া শহরে। খুঁজে পেতে অসুবিধা হল না। শহরজোড়া হোর্ডিং আর ফেস্টুন। তাতে লেখা ” বাগী মাধো সিং কা জাদু”। স্থানীয়দের জিজ্ঞেস করে জায়গাটা জেনে নিলাম। তখন এটোয়াতে এক্কা গাড়ি চলত। “এক্কা গাড়ী ওই ছুটেছে” করে ছুটলাম মাধো সিং এর জানাডুতে। সে একেবারে হই হই ব্যাপার। রীতিমত তাঁবু খাটিয়ে চলছে মাধো সিং এর জাদুর প্রচার। তাক লেগে গেল দর্শকদের লাইন দেখে। এই লাইন ঠেলে জাদুকরের সামনে যাবো কি করে? চারদিক একটু ঘোরাঘুরি করে আসার পর মনে হল, এই শোয়ের নিশ্চয় একজন ম্যানেজার আছে। যে ভাবেই হোক তাঁকে ঝুঁজে বার করতে হবে। তার সঙ্গে দেখা করতে হবে। ম্যানেজারের ঘরের সামনে বেশ ভিড় । স্বাভাবিক। এত বড় জাদুকর, তার ওপর সেলিব্রিটি বাগী। তার জাদু প্রদর্শন নিয়ে যে ব্যাস্ততা থাকবে তা স্বাভাবিক।আমাদের হাতের তাস একটাই। সেটাই প্রয়োগ করলাম। বললাম, হামলোগ কলকাত্তা সে আয়া। মাধো জি কেয়সা ম্যাজিক দিখাতে হ্যায় ও দেখনে কে লিয়ে আয়া। ব্যাস এক ডোজেই মিরাক্যাল। ম্যানেজারবাবু গদ গদ ভাবে ঘর থেকে বেরিয়ে এসে বললেন, সমঝ গেয়া। সরকার স্যার নে আপকো ভেজা না? কই বাত নেহি। আপ বাগী জিকা খেল আপকা আখো সে  দেখ লিজিয়ে। সরকার স্যার কো বোলনা কলকাত্তা মে বাগীজীর একটা ” শো” করতে। চম্বল কা সব আদমি সাথ লেকর হামলোগ জায়েগা।

কে এই সরকার স্যার? সরকার শুনলেই মনে হবে পিসি সরকার। অসম্ভব। সুদুর চম্বল থেকে কলকাতা এসেছিল খুঁখার বাগী মাধো সিং এ একেবারে গুলগাপ্পা। “ইন্দ্রজাল” থেকে এমন কোনো সংবাদ প্রচার করা হয়েছিল বলে জানা নেই।

যাইহোক,  হঠাত দেখলাম ম্যানেজারবাবু ভিতরের ঘর থেকে বেরিয়ে এসে গদগদ ভাবে বললেন,  আইয়ে আইয়ে। তস্রিফ রাখিয়ে। অবাক হয়ে বলল, আপ কলকাত্তা সে আয়া স্রেফ বাগীজি কা জাদু দেখনে কে লিয়ে? জাদু দেখার যে বিন্দু মাত্র ইচ্ছে আমাদের নেই তাকে তা বোঝাই কি করে?

গম্ভীর হয়ে মৃদুলদা জানাল, জাদু দেখনে কা পহলে সিংজি কা সাথ কুছ বাত চিত ছিল! তাকে কি পাওয়া যাবে? নইলে “সরকার” স্যারকে কি বলব? ম্যানেজার সাহেব হালুম হুলুম করে বলে ঊঠল, জরুর জরুর, বাগীজী এখনই আসছে। 

মুহূর্তের মধ্যে মাধো সিং সাজুগুজু না করেই আমাদের সামনে এসে হাজির। একেবারে হাত ধরে প্রাইভেট রুমে নিয়ে গেল। পরিস্কার বাংলায় বলল, সরকার স্যার আপনাদের পাঠিয়েছে? আরে দাদা একটা খবর তো দিতে হয়? সরকার স্যার নিজের হাতে আমায় ম্যাজিক শিখিয়েছে ।

আমরা হেঁ হেঁ করতে করতে তার কথা শুনতে লাগলাম। কোনো প্রতিবাদ নয়। জবুথুবু হয়ে মাধো সিং এর ম্যাজিকাল কাহিনি শুনতে লাগলাম।

মাধো সিং অতীব হ্যন্ডসাম দেখতে। একে ঠাকুর তায় রাজপুত ক্ষত্রীয়। দীর্ঘদেহী,  নির্বেদ, লম্বায় প্রায় ৬ ফুট। পরনে সাদা সাফারি স্যুট। মান সিং এর দল ছিল মাত্র ১৭ জনের। শুনলে আশ্চর্য লাগে মাধো সিং ৫০০ জনের একটি আর্মি বানিয়ে ফেলিয়েছিলেন। ৬ থেকে ৭ দশক পর্যন্ত ছিল তার রাজত্ব। উত্তরপ্রদেশ সরকার ৭ এর দশকেই তার মাথার দাম ঘোষণা করেছিল দেড় লাখ টাকা। এখনকার হিসেবে কত হয় তা নিশ্চয় আন্দাজ করা যাচ্ছে? মাধো সিংং নাকি এক সময় সেনাদলে ছিলেন। নিজের মুখেই তা আমাদের জানিয়েছিলেন। সত্য মিথ্যা যাচাই করা সে সময় আমাদের উপায় ছিল না। তখন গুগুল ছিল না। অবসরের পর তার হিরো হবার বাসনা হয়। এতদিন গোলাগুলি চালিয়ে এখন আর ভালো লাগছে না। সুতরাং একটাই পথ। গোলাগুলির প্র‍্যাকটিস বজায় রাখতে বেহড়ে চলে যাওয়া। তাই হল। মাধো সিং ডাকাইত হইলেন।

মাধোর বিরুদ্ধে ২৩ টি হত্যা,  ৫০০ টি ডাকাতির এবং ৭০০ টি অপহরণের অভিযোগ ছিল। ৭২ সালে মাধো দলবল সহ সর্বোদয় নেতা জয়প্রকাশ নারায়নের কাছে আত্বসমর্পন করে এবং সেলিব্রিটি হিসেবে আত্বপ্রকাশ করেন।

ব্যাক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে বুঝেছিলাম মাধো সিং ঠিক কোনো সামাজিক কারনে প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতে ডাকাতের জীবন বেছে নেয়নি। সে তেহসিলদার বা রূপ সিং এর মতো গ্রাম্য সরল নয়। যদি তাই হত, তবে তার দলের সদস্য সংখ্যা ৫০০ পেরিয়ে যেত না। পুলিশের সঙ্গে তার প্রিয় খেলা ছিল লুকোচুরি। কতবার যে ছদ্মবেশে সে পুলিশকে ধোকা দিয়ছে তার কোনো হিসেব নেই। তিনটি রাজ্য মানে উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ ও রাজস্থানের প্রতিটি শহরে ছিল তার মুখবির সিন্ডিকেট। তারা মাইনে পেত নিয়মিত। এই নেটওয়ার্ক চালানোর ক্ষমতা মাধো সিং এর ছিল।

কথাবার্তার মধ্যেই ম্যানেজার এসে জানিয়ে গেল শোয়ের টাইম হয়ে গেছে। মৃদুলদা মাধো সিংকে অনুরোধ করল,”পরিবর্তন” পত্রিকার পাঠকদের জন্য একটা শুভেচ্ছা বার্তা লিখে দিতে। এই ধরনের কাজ বাগীজীর পক্ষে খুব সুখকর হল না। এক দিস্তা কাগজ ছেড়ার পরও যখন লেখা হয়ে উঠল না তখন মৃদুল দা দয়াপরবশ হয়ে হাতজোর করে বলল, ছেড়ে দিন স্যার। আমিই বরঞ্চ লিখে দিচ্ছি। আপনি শুধু সইটা করে দিন। এতগুলি পাতা ছেড়ার পর মাধো সিং এর মেজাজটা বোধহয় খিচড়ে গেছিল। মৃদুলদাকে সটান বলে দিল, ম্যানেজারবাবুই আমার সইটা করে দেবে। ওকে ভালো করে শিখিয়ে দিয়েছি।

রছেড় ফিরে এসে দুদিন বসেই আছি। খাচ্ছি দাচ্ছি, বেহড়ে বেড়াতে যাচ্ছি। আর যখন তখন কফি মেশানো খাঁটি দুধ খাচ্ছি।

আমাদের সঙ্গে সব সময় অন্তত ২০ থেকে ২৫ জন। ওদের গ্রামীন আলস্যের মধ্যে আমরা একটু উত্তেজনা দিতে পেরেছি,  তাই বা কম কী! আমাদের নিয়ে ওরা যে ঠিক কি করবে তা যেন বুঝে উঠতে পারছে না। তবে একটা টেকনিক শিখলাম। বাচ্চাদের কাছ থেকে। বেহড়ে পথ হারিয়ে ফেললে কি করে গ্রামে ফিরে আসা যায় তার উপায়।

ধরা যাক, বেহড়ের গোলকধাঁধায় কেউ পথ গুলিয়ে ফেলেছে। অন্ধের মতো রাস্তা না খুঁজে বরঞ্চ কোনো ছাগলের খোঁজ করা ভালো। হ্যাঁ ছাগল। এই ব্যাপারে তাদের বুদ্ধি মানুষের চাইতে বেশি।

গ্রাম থেকে গলায় ঘন্টি বেধে ছাগল চড়তে আসে বেহড়ে। তাদের থেকে ভালো বেহড় চেনে এমন কেউ নেই চম্বল তল্লাটে। আপনাকে অপেক্ষা করতে হবে ততক্ষণ, যতক্ষণ না শ্রীমান ছাগল গ্রামে ফিরে যাওয়া মনস্থ করে। আপনি শুধু মৃদু পদ শব্দে অভিসারিকার মতো তাকে অনুসরণ করে পৌঁছে যান ছাগলের গ্রামে। তা যদি আপনার গ্রাম নাও হয়, জিজ্ঞেস করে নিজের গ্রামে পৌঁছে যাওয়া খুব একটা মুস্কিল হবে না। এটাই বেহড়ের গুপ্ত কথা।

রতন কথা দিয়েছিল খেরা রাঠোর গ্রামে মান সিং এর বাড়ি নিয়ে যাবে। কিন্তু এই প্রসঙ্গ উঠলেই ও কেমন যেন এড়িয়ে যেত, একটু হেসে। বলত, হোগা হোগা। জরুর হোগা। থোড়া টাইম লগেগা। রতন যে চেষ্টার কোনো ত্রুটি রাখবে না, তা এতদিনে বুঝে গেছি।

ঠিক দু দিনের মাথায় এক রাতে সে বলল, কাল খুব সকালে বেরোতে হবে। বড়েবাবা আপলোগো কে লিয়ে  ইন্তেজার কর রহা হ্যায়। কিন্তু একটু অসুবিধা হবে আপনাদের। আমরা হায় হায় করে উঠলাম, অসুবিধা হবে আমাদের!? বড়েবাবার সঙ্গে দেখা করার জন্য আমরা এভারেস্টেও যেতে পারি, এমন কী অক্সিজেন ছাড়াই। আটলান্টিকও পাড়ি দিতে পারি লাইফ জ্যাকেট ছাড়াই। আমাদের এ হেন উৎসাহ দেখে রতন হাসতে হাসতে বলল, না না, এতকিছু করতে হবে না। আসলে বাসে চেপে গেলে লোকে টের পেয়ে যাবে। পুলিশও। হুধু শুধুআপনাদের হ্যারাস করতে পারে। তাই বেহড়ের পথে উটের পিঠে গেলেই ভালো হত। রাস্তাও কম হত, নিরাপদও বটে। উটের কথা উঠতেই আবার লালমোহনবাবুর কথা মনে পড়ে গেল। মৃদুলদার অবস্থাও আমারই মত। রতন চলে যাবার পর শুরু হল আমাদের কোমরের ব্যায়াম, প্রায় সারা রাত। জটায়ুর স্টাইলে।

(ক্রমশ)

Related Posts

Leave a Reply