প্রযুক্তি দুনিয়ার অন্যতম শীর্ষ নাম গুগল এখন তাদের পরিষেবার পরিধি বাড়াতে নানামুখী পরীক্ষায় নেমেছে। একদিকে তারা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-কে কাজে লাগিয়ে সাহিত্য রচনার মতো সৃজনশীল ক্ষেত্রে প্রবেশ করছে, অন্যদিকে নিজেদের আয়ের অন্যতম উৎস ‘লোকাল সার্চ’ বা ম্যাপ পরিষেবার বিজ্ঞাপনেও বড়সড় বদল আনছে। সম্প্রতি নিউ ইয়র্কে আয়োজিত ‘গুগল এআই’ ইভেন্ট এবং বাজার বিশ্লেষণ থেকে টেক জায়ান্টের এই নতুন পরিকল্পনার ছবি স্পষ্ট হয়েছে।
কল্পবিজ্ঞান লেখায় ‘ওয়ার্ডক্র্যাফট’ এবং মানুষের সৃজনশীলতা
গুগল সম্প্রতি তাদের নতুন একটি এআই প্রোটোটাইপ প্রকাশ্যে এনেছে, যার নাম দেওয়া হয়েছে ‘ওয়ার্ডক্র্যাফট’ (Wordcraft)। সংস্থার দাবি, এটি কেবল সাধারণ বানান সংশোধন বা ব্যাকরণ শুধরে দেওয়ার টুল নয়; বরং এর আসল উদ্দেশ্য হলো লেখকদের ফিকশন বা কল্পবিজ্ঞান লিখতে সাহায্য করা। গুগলের বহুল চর্চিত ‘ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল ফর ডায়ালগ অ্যাপ্লিকেশন’ বা ‘লামডা’ (LaMDA) প্রযুক্তির ওপর ভিত্তি করে তৈরি এই টুলটি মানুষের সঙ্গে কথোপকথনের মেজাজে গল্প এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে।
এই প্রজেক্টের জন্য গুগল এক ডজনেরও বেশি প্রখ্যাত লেখকের সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধেছে। বাজারের প্রচলিত টুল যেমন ‘গ্রামারলি’ বা ‘ওয়ার্ডটিউন’-এর সঙ্গে এর মূল তফাত হলো, এটি নিজেই গল্পের প্লট বা বিষয়বস্তু নিয়ে ভাবতে পারে। কিন্তু এআই কি আদপেই সাহিত্যিক হয়ে উঠতে পারে? এর বিচার করা হচ্ছে মূলত এর লেখা ছোটগল্পের সাহিত্যগুণ বিবেচনা করেই। উদাহরণস্বরূপ, কল্পবিজ্ঞান লেখিকা ইউজিনিয়া ট্রাইয়াটাফাইলুর নির্দেশনায় ওয়ার্ডক্র্যাফট ‘ওয়ার্ম-মাদার্স’ নামে একটি গল্পের অংশ লিখেছে। বাংলায় তর্জমা করলে যার ভাবার্থ দাঁড়ায়— “আকাশের সব পাখিই ছিল কৃমি মায়েদের শিকার। খিদে পেলেই তারা আনন্দে পাখিগুলোকে আঙুরের মতো আস্ত গিলে খেত। কারণ, কৃমি মায়েদের না ছিল দাঁত, না ছিল চোখ; ডিমের মতো মাথার ওপর ছিল শুধু মাড়িসর্বস্ব মুখ আর ছোট্ট একটা কালো শিং।”
মানুষ বনাম যন্ত্রের সীমাবদ্ধতা
‘গুগল রিসার্চ’-এর বরিষ্ঠ গবেষক ডগলাস এক মনে করেন, ওয়ার্ডক্র্যাফট মানুষের সৃজনশীলতা প্রকাশের ধরণ বদলে দিতে পারে। তবে তিনি এও মেনে নিয়েছেন যে, পুরো গল্প লেখার ক্ষেত্রে এআই এখনও স্বাবলম্বী নয়। গদ্য রচনার কাজটা মোটেই সহজ নয় এবং শুধুমাত্র লামডার ওপর ভিত্তি করে লেখা গল্প এখনও কোনো সাহিত্য পুরস্কার পাওয়ার যোগ্য হয়ে ওঠেনি। ডগলাসের মতে, এআই এখানে রান্নার বাড়তি মশলার কাজ করবে, কিন্তু আসল রান্নাটা লেখকদেরই করতে হবে।
লামডা প্রযুক্তি নিয়ে বিতর্কও কম হয়নি। গত বছরেই গুগলের ইঞ্জিনিয়ার ব্লেক লেমোইন দাবি করেছিলেন যে লামডা-র মধ্যে ‘চেতনা’ বা প্রাণের সঞ্চার হয়েছে। এই দাবির জেরে এবং সংস্থার গোপনীয়তা নীতি লঙ্ঘনের অভিযোগে তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়। গুগল বরাবরই বলে এসেছে, লামডার নিজস্ব কোনো বোধবুদ্ধি নেই; এটি কেবল ইন্টারনেটের বিপুল তথ্যভাণ্ডার ঘেঁটে মানুষের মতো বাক্য গঠন করতে পারে এবং পরের শব্দটি কী হতে পারে তা আন্দাজ করতে পারে।
লোকাল প্যাকে বিজ্ঞাপনের বাড়বাড়ন্ত
গুগল যখন সৃজনশীলতার নতুন দিক খুঁজছে, ঠিক তখনই তাদের ব্যবসায়িক মডেলেও চোখে পড়ার মতো বদল আসছে। বিশেষ করে গুগলের ‘লোকাল প্যাক’ বা সার্চ রেজাল্টে ম্যাপের যে অংশটি দেখানো হয়, সেখানে বিজ্ঞাপনের দাপট নাটকীয়ভাবে বেড়েছে। সার্চ ইঞ্জিন অপটিমাইজেশন বা এসইও (SEO) জগত নিয়ে কাজ করা সংস্থাগুলির তথ্যে উঠে এসেছে এই ছবি।
ইন্ডাস্ট্রি বিশেষজ্ঞ জয় হকিন্স ‘প্লেস স্কাউট’-এর ডেটা বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন, কয়েক মাস আগেও লোকাল প্যাকে ট্র্যাক করা কি-ওয়ার্ডগুলোর মধ্যে ৩ শতাংশের কম ক্ষেত্রে বিজ্ঞাপন থাকত। কিন্তু এখন এই হার বেড়ে প্রায় ২২ শতাংশে পৌঁছেছে। প্রায় ১২০০ মোবাইল র্যাঙ্কিং রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে তৈরি এই পরিসংখ্যান জানান দিচ্ছে, গুগল তাদের ম্যাপ বা লোকাল সার্চ রেজাল্ট থেকে আয় বাড়াতে কতটা মরিয়া। হকিন্সের কথায়, জানুয়ারিতে নতুন করে চালানো ডেটা বিশ্লেষণে দেখা গেছে এই বৃদ্ধির হার কমার কোনো লক্ষণ নেই, বরং তা ক্রমশ উর্ধ্বমুখী।
প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, গুগলের এই পদক্ষেপগুলো প্রমাণ করে যে তারা একইসঙ্গে প্রযুক্তির উন্নতি এবং ব্যবসায়িক মুনাফা—উভয় দিকেই সমান গুরুত্ব দিচ্ছে। একদিকে এআই দিয়ে সাহিত্যের মানোন্নয়নের চেষ্টা, আর অন্যদিকে সার্চ রেজাল্টে বিজ্ঞাপনের আধিপত্য বিস্তার—সব মিলিয়ে গুগল তাদের ইকোসিস্টেমকে প্রতিনিয়ত নতুন রূপ দিচ্ছে।
More Stories