4 মার্চ 2026

বিশ্বজুড়ে স্বর্ণের বাজারে বড় ধস: শক্তিশালী ডলার ও ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার প্রভাব

বাঙালির জীবনে সোনা কেবল একটি অলংকার নয়, এটি সঞ্চয়েরও অন্যতম প্রধান মাধ্যম। তাই কেনার সামর্থ্য বা ইচ্ছা থাকুক বা না থাকুক, সোনার দাম বাড়লে ক্রেতাদের কপালে যেমন চিন্তার ভাঁজ পড়ে, তেমনি দাম কিছুটা কমলে মনে স্বস্তি আসে। আন্তর্জাতিক বাজারের নানা অর্থনৈতিক রদবদল, সরবরাহ এবং চাহিদার উপর ভিত্তি করেই মূলত এই মূল্যবান ধাতুর দাম ওঠানামা করে। মঙ্গলবার বিশ্ববাজারে ব্যাপক দরপতনের পর ৩ মার্চ, ২০২৬ তারিখে স্থানীয় বাজারেও এর স্পষ্ট প্রভাব লক্ষ্য করা গেছে। এদিন কলকাতায় ২২ ক্যারেট হলমার্ক করা সোনার দাম প্রতি গ্রামে ৬৫ টাকা কমে ১৬,০৬০ টাকায় দাঁড়িয়েছে। একইভাবে খুচরো এবং পাকা সোনার দামেও প্রতি গ্রামে ৭০ টাকা করে পতন হয়েছে, যার বর্তমান মূল্য যথাক্রমে ১৬,৮৯৫ এবং ১৬,৮১০ টাকা।

বিশ্ববাজারে বড় ধাক্কা

স্থানীয় বাজারে সোনার দাম কমার এই চিত্রটি মূলত বৈশ্বিক বাজারের এক বিশাল ঝড়েরই ক্ষুদ্র প্রতিফলন। মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দাম একধাক্কায় প্রায় ৪ শতাংশ পর্যন্ত পড়ে যায়। মার্কিন ডলারের দাম হঠাৎ করে বেড়ে যাওয়ার কারণেই মূল্যবান এই ধাতুর উপর বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। ঝুঁকি এড়াতে বিনিয়োগকারীরাও অন্যান্য বাজার থেকে দ্রুত মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। এই দরপতনের ফলে ফেব্রুয়ারির পর থেকে স্বর্ণের দাম একেবারে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। সেই সাথে সপ্তাহান্তে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের হামলার পর যে মূল্যবৃদ্ধির আশা করা হয়েছিল, সেটিও পুরোপুরি মুছে গেছে। জানুয়ারির শেষের দিকের পর এটিই একদিনে স্বর্ণের সবচেয়ে বড় দরপতন।

ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা ও ডলারের উল্লম্ফন

ইরানে হামলার পর বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়ে যাওয়ার একটা আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। অনেকেই ভেবেছিলেন এর ফলে হয়তো মূল্যস্ফীতি বাড়বে। কিন্তু ফেডারেল রিজার্ভ আগের ধারণার চেয়ে কম সুদের হার কমাতে পারে— এমন সম্ভাবনা জোরালো হওয়ায় পরিস্থিতির মোড় ঘুরে যায়। পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে মার্কিন ডলারের সূচক গত তিন মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানোর ফলে।

ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের সিনিয়র ফেলো রবিন ব্রুকস সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে জানিয়েছেন, ডলারের এই উল্লম্ফন বা খাড়াভাবে বেড়ে যাওয়ার প্রবণতা পরিস্থিতিকে চরম অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে। সাধারণত ডলার শক্তিশালী হলে অন্য দেশগুলো নিজেদের মুদ্রার মান ধরে রাখতে মার্কিন ট্রেজারি বন্ড বিক্রি করে দেয়। এর ফলে বন্ড ইয়েল্ড বা মুনাফা বেড়ে যায় এবং বিনিয়োগকারীদের কাছে স্বর্ণ ধরে রাখার আকর্ষণ কমতে থাকে। তাছাড়া, বিদেশি ক্রেতাদের জন্য ডলারের বাড়তি দাম স্বর্ণ ও অন্যান্য সম্পদকে আরও ব্যয়বহুল করে তোলে। এটি স্বভাবতই বাজারে চাহিদাকে কমিয়ে দেয়।

শেয়ারবাজার ও অন্যান্য ধাতুর বেহাল দশা

শুধু স্বর্ণই নয়, পুরো মূল্যবান ধাতুর বাজারেই মঙ্গলবার বড় ধরনের ধস নেমেছে। এদিন রুপার দাম ৮ শতাংশ, প্ল্যাটিনাম ১০ শতাংশ এবং প্যালাডিয়াম ৭ শতাংশ কমেছে। জেপি মরগান চলতি সপ্তাহে এক পূর্বাভাসে বলেছিল, মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাতের কারণে স্বর্ণের দামে ‘রিস্ক প্রিমিয়াম’ ১০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। ঐতিহাসিকভাবে দেখা যায়, শেয়ারবাজারে যদি ধস নামে এবং ব্যবসায়ীরা নগদ অর্থের জন্য বা মার্জিন কল মেটাতে সম্পদ বিক্রি করতে বাধ্য হন, তখন দামের এই ধরনের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা ধরে রাখা খুব কঠিন হয়ে পড়ে।

বাস্তবে ঠিক এই ঘটনাটিই ঘটেছে। মঙ্গলবার নাসডাক কম্পোজিট সূচক প্রায় ২ শতাংশ পড়ে যায়। এসঅ্যান্ডপি ৫০০ এবং ডাও জোন্স ইন্ডাস্ট্রিয়াল এভারেজেরও ১ শতাংশের বেশি পতন হয়েছে। কেবল যুক্তরাষ্ট্রেই নয়, লন্ডনের এফটিএসই সূচক ৩ শতাংশ কমার পাশাপাশি এশিয়ার শেয়ারবাজারগুলোতেও বড় ধরনের ধস নেমেছে। ট্রেড নেশনের সিনিয়র বাজার বিশ্লেষক ডেভিড মরিসন বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে সতর্ক করে বলেছেন, বিক্রির এই চাপ যদি এভাবেই বাড়তে থাকে, তবে স্বর্ণের দাম ৫,০০০ ডলারের শক্তিশালী সাপোর্ট লেভেলের দিকে নেমে যাওয়ার আশঙ্কা একেবারেই উড়িয়ে দেওয়া যায় না।