টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের মহারণ যখন দোরগোড়ায়, তখন এশিয়ার দুই শক্তিশালী দল—বাংলাদেশ ও ভারত—দুই ভিন্ন ধরনের সমস্যায় জর্জরিত। একদিকে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ‘ডু-অর-ডাই’ ম্যাচের আগে ইনজুরির কালো ছায়া বাংলাদেশ শিবিরে, অন্যদিকে সিরিজ জয়ের পরেও নিজেদের কম্বিনেশন নিয়ে সংশয়ে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন ভারত।
পাকিস্তানের বিরুদ্ধে লিটনকে ঘিরে ধোঁয়াশা পাকিস্তানের বিপক্ষে বাঁচামরার লড়াইয়ে নামার ঠিক আগেই বড়সড় দুঃসংবাদ তাড়া করছে বাংলাদেশ দলকে। হ্যামস্ট্রিংয়ের চোটে দলের অন্যতম সেরা ব্যাটার লিটন দাসের খেলা নিয়ে তৈরি হয়েছে গভীর অনিশ্চয়তা। শনিবার ডাক্তারি পরীক্ষার পরেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হবে যে তিনি পাকিস্তানের বিরুদ্ধে মাঠে নামতে পারবেন কি না। ভারতের বিরুদ্ধে ম্যাচে লিটনের সেই বিধ্বংসী ইনিংসের কথা ভোলার নয়। ওপেন করতে নেমে মাত্র ২৭ বলে ৬০ রানের যে ঝড় তিনি তুলেছিলেন, তা এক কথায় ছিল অনবদ্য। কিন্তু শান্তর সঙ্গে ভুল বোঝাবুঝিতে সেই রান আউটই শেষমেশ কাল হয়ে দাঁড়ায়। লিটন ফিরতেই তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়েছিল বাংলাদেশের ব্যাটিং লাইনআপ, আর শেষমেশ ৫ রানের আক্ষেপ নিয়ে মাঠ ছাড়তে হয়েছিল লাল-সবুজ ব্রিগেডকে।
লিটনের এই হ্যামস্ট্রিংয়ের সমস্যা অবশ্য নতুন নয়। কিছুদিন আগেই জিম্বাবোয়ে সিরিজের মাঝপথে এই একই কারণে তিন সপ্তাহ মাঠের বাইরে থাকতে হয়েছিল তাঁকে। সেমিফাইনালে ওঠার জটিল সমীকরণে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে লিটনকে না পাওয়াটা টাইগারদের জন্য নিঃসন্দেহে বড় ধাক্কা।
চ্যাম্পিয়ন ভারতের অমিমাংসিত প্রশ্ন সীমান্তের ওপারে যখন চোট-আঘাতের সমস্যা, তখন ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন ভারতের ড্রেসিংরুমেও কিন্তু স্বস্তির বাতাস নেই। নিউজিল্যান্ডকে ৪-১ ব্যবধানে হারিয়ে সিরিজ জিতলেও, বিশ্বকাপ ধরে রাখার অভিযানে নামার মাত্র এক সপ্তাহ আগে রোহিত শর্মার দলের সামনে এমন তিনটি প্রশ্ন ঝুলছে, যার উত্তর এখনো মেলেনি। সিরিজ জয় এটাই প্রমাণ করে যে ভারত প্রতিপক্ষকে গুঁড়িয়ে দিতে পারে, কিন্তু দলের ভারসাম্য এখনো পুরোপুরি থিতু হয়নি। নক-আউট পর্বে নতুন করে পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগ থাকবে না।
ওপেনিং ও উইকেটের পিছনে কে? নিউজিল্যান্ড সিরিজটা হওয়ার কথা ছিল ফাইনাল অডিশন, কিন্তু সেটা আদতে ধোঁয়াশাই বাড়াল। অভিষেক শর্মা পাওয়ারপ্লে-তে আগ্রাসী মনোভাব দেখিয়ে নিজের জায়গা পাকা করে ফেলেছেন। কিন্তু তাঁর সঙ্গী কে হবেন, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন। সঞ্জু স্যামসনকে খেলানোর যুক্তি তাঁর পারফরম্যান্সে খুব একটা জোরালো হচ্ছে না, অন্যদিকে শেষ ম্যাচে ঈশান কিষাণ যেভাবে অতিমানবীয় সেঞ্চুরি হাঁকালেন, তাতে সমীকরণ বদলে গেছে। দলে দুজন উইকেটকিপার-ব্যাটার বয়ে বেড়ানো বিলাসিতা, আবার প্রতি ম্যাচে ওপেনার বদলানোও কাজের কথা নয়। বিশ্বকাপ মঞ্চে এখন ম্যানেজমেন্টকে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হবে—দল নির্বাচন কি রোলের স্পষ্টতার ভিত্তিতে হবে, নাকি শেষ ম্যাচের পারফরম্যান্স দেখে?
বোলিং এবং প্ল্যান-বি নিয়ে চিন্তা দ্বিপাক্ষিক সিরিজে প্রচুর রান খরচ করেও ম্যাচ জেতা যায়, কিন্তু বিশ্বকাপে এটা বড় ফাঁদ। পাওয়ারপ্লে-তে উইকেট না পেলে বা এক ওভারে প্রচুর রান খরচ হলে টুর্নামেন্ট থেকেই ছিটকে যাওয়ার ভয় থাকে। বুমরাহ এবং অর্শদীপ সিং ভরসা দিলেও, পাটা উইকেটে তৃতীয় পেসার হিসেবে কার ওপর ভরসা রাখা হবে, তা এখনো পরিষ্কার নয়। হার্দিক বা দুবেকে দিয়ে কতগুলো ওভার করানো হবে, সেই ব্লু-প্রিন্টও অস্পষ্ট।
একইভাবে ভাবাচ্ছে ব্যাটিংয়ের ‘প্ল্যান-বি’। বিশাখাপত্তনমে ভারতের হার বুঝিয়ে দিয়েছে, মোমেন্টাম হারিয়ে ফেললে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। টপ অর্ডার ব্যর্থ হলে মিডল অর্ডার কি ধস সামলাতে প্রস্তুত? তিলক বর্মা কি ক্রাইসিস ম্যান হবেন, নাকি রিঙ্কু সিং শুধুই ফিনিশার হিসেবে খেলবেন? চ্যাম্পিয়ন দল কেবল প্রতিভা দিয়ে হয় না, খারাপ শুরুর পরেও ঘুরে দাঁড়ানোর ক্ষমতা থাকতে হয়। ভারত প্রতিপক্ষকে চাপে ফেলতে পারে ঠিকই, কিন্তু খেলা যখন নিজেদের পরিকল্পনামাফিক এগোবে না, তখন তারা কতটা সংহত থাকতে পারবে, সেটাই এখন লাখ টাকার প্রশ্ন।
More Stories
তিলকের ঝোড়ো প্রত্যাবর্তনে বিশ্বকাপের আগে স্বস্তি ভারতীয় শিবিরে, অন্যদিকে জমে উঠল গ্রুপ পর্বের অঙ্ক