7 মে 2026

যন্ত্রের যুগে মানুষ গড়ার কারিগর: এআই নিয়ে দার্শনিক ভাবনা বনাম শ্রেণিকক্ষের বাস্তবতা

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই নিয়ে আয়োজিত কোনো সম্মেলনে সাধারণত কোডিং, ডেটা অ্যালগরিদম বা কম্পিউটেশনাল স্কেল নিয়ে ভারী ভারী আলোচনা হওয়ার কথা। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, সম্প্রতি এমন একটি সম্মেলনে সবচেয়ে দাগ কেটে যাওয়া মুহূর্তগুলো প্রযুক্তির সক্ষমতা নিয়ে ছিল না। বরং প্রশ্নটা ছিল মানুষ হিসেবে আমাদের অস্তিত্ব নিয়ে। প্রযুক্তি যে হারে বদলাচ্ছে, কোনো একক প্রতিষ্ঠান, শিল্পখাত বা ব্যক্তির পক্ষে তার সাথে তাল মেলানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ছে। আর ঠিক এই দমবন্ধ করা সময়েই ‘পরিপূর্ণ মানুষ’ হয়ে ওঠার মানে আসলে কী, সেই প্রশ্নটাই সবচেয়ে বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

গত ২৩ ও ২৪ এপ্রিল, ২০২৬ তারিখে গনজাগা ইউনিভার্সিটিতে (Gonzaga University) অনুষ্ঠিত ‘ভ্যালু অ্যান্ড রেসপন্সিবিলিটি ইন এআই টেকনোলজিস’ শীর্ষক দ্বিতীয় বার্ষিক সম্মেলনে দ্রুতগামী উদ্ভাবন আর মানুষের চিরন্তন প্রশ্নগুলোর একটা দারুণ মেলবন্ধন দেখা গেছে। বিশ্বের অনেক নামিদামি প্রতিষ্ঠানই যেখানে এআইয়ের দৌড়ে হাঁপিয়ে উঠছে, গনজাগা সেখানে একটু থেমে উল্টো প্রশ্ন করছে— একজন মানুষের সার্বিক বিকাশে এআইয়ের ভূমিকা আসলে কী? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই তারা বিভিন্ন সম্প্রদায়কে এক ছাদের নিচে নিয়ে এসেছে। আয়োজনে উপস্থিতির সংখ্যা গত বছরের ১৮০ থেকে বেড়ে এবার প্রায় ৩০০-তে দাঁড়িয়েছে। তবে সংখ্যার চেয়েও চমকপ্রদ ব্যাপার হলো কারা এসেছিলেন। ওয়াশিংটন স্টেটের নানা প্রান্তের স্কুল শিক্ষক, প্রশাসক, বিশ্ববিদ্যালয় গবেষক, উদ্যোক্তা থেকে শুরু করে সাধারণ শিক্ষার্থী ও ব্যবসায়িক নেতারা— কে ছিল না সেখানে!

সবারই নিজস্ব কিছু জিজ্ঞাসা ছিল, আর সেই আড্ডা থেকেই উঠে এলো প্রাইমারি স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে অবসর জীবন পর্যন্ত বিস্তৃত এক যাপিত জীবনের গল্প। এআইয়ের প্রভাব জীবনের কোনো একটা নির্দিষ্ট ধাপে আটকে থাকে না। এটি আমাদের শেখার ধরন, নিজেকে চেনার প্রক্রিয়া আর সমাজের প্রতি আমাদের অবদান— সবকিছুকেই প্রতিনিয়ত নতুন করে ভাবায়। ইনস্টিটিউট ফর ইনফরমেটিক্স অ্যান্ড অ্যাপ্লায়েড টেকনোলজির ডিরেক্টর জে ইয়াং বিষয়টা চমৎকারভাবে তুলে ধরেছেন। তার মতে, উদ্দেশ্যটা হলো সারা জীবন ধরে এআইয়ের সাথে একটা অর্থবহ ও উদ্দেশ্যমূলক সম্পর্ক তৈরি করা। বিশ্ববিদ্যালয়, স্কুল আর শিল্পখাতকে এক সুতোয় গেঁথে এমন একটা মডেল দাঁড় করানোর চেষ্টা করছে গনজাগা, যেখানে মানুষ শুধু কারিগরি দক্ষতাই অর্জন করবে না, বরং এই পরিবর্তনের সাথে মানিয়ে নেওয়ার আত্মবিশ্বাসও পাবে।

সম্মেলনের শুরুতেই জেসুইট স্কলারদের একটা প্যানেল এমন কিছু প্রশ্ন তুলে ধরে, যা সচরাচর এআইয়ের আলোচনায় এড়িয়ে যাওয়া হয়। এআই কীভাবে মানুষের আত্মপরিচয়, নিজস্ব স্বাধীনতা আর নৈতিক দায়িত্ববোধকে চ্যালেঞ্জ করছে, তা নিয়ে তারা দীর্ঘ আলোচনা করেন। সেখানে উপস্থিত একজন বক্তা, যিনি সরাসরি শীর্ষ এআই ডেভেলপারদের সাথে কাজ করেন, জানালেন উদীয়মান মডেলগুলোতে কীভাবে নৈতিক যুক্তিবোধ ঢুকিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। শুরুতে যাকে নিছকই একটি তাত্ত্বিক আলোচনা মনে হচ্ছিল, সেটাই একসময় সবার মনের কথা হয়ে দাঁড়ালো— এআই নিয়ে সবচেয়ে জরুরি প্রশ্নগুলো আসলে টেকনিক্যাল নয়, সেগুলো একান্তই মানবিক।

সম্মেলনের এই দার্শনিক আড্ডার ঠিক উল্টো পিঠেই কিন্তু রয়েছে আমাদের শ্রেণিকক্ষের রূঢ় বাস্তবতা। একদিকে বিশেষজ্ঞরা যখন এআইয়ের মাধ্যমে মানুষ গড়ার রূপরেখা খুঁজছেন, অন্যদিকে মাঠে থাকা শিক্ষকরা এই প্রযুক্তি নিয়ে দিন দিন আরও বেশি সন্দিহান হয়ে পড়ছেন। টিচার অ্যাপ্রিসিয়েশন উইক উপলক্ষে সম্প্রতি প্রকাশিত স্প্রিং টিচার সার্ভের ফলাফল এবং গ্যালপ (Gallup) ও ওয়ালটন ফ্যামিলি ফাউন্ডেশনের করা জেনারেশন জেড-এর (১৪-২৯ বছর বয়সী) উপর করা একটি জরিপ মিলিয়ে দেখলে চিত্রটা বেশ পরিষ্কার হয়।

জরিপ বলছে, জেন জি বা তরুণ প্রজন্ম নিজেরাই এখন এআইয়ের উপকারিতা নিয়ে বেশ সংশয়ে ভুগছে। গত বছরের তুলনায় এআইয়ের প্রতি তাদের নেতিবাচক মনোভাব বেড়েছে। তাদের বড় একটা ভয় হলো, এই প্রযুক্তি হয়তো তাদের প্রকৃত শেখার প্রক্রিয়া আর দক্ষতা অর্জনের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াবে। যেহেতু এই প্রজন্মের বড় একটা অংশ এখনও স্কুলে পড়ছে, তাই এআই নিয়ে শিক্ষার্থীদের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি বোঝার জন্য এই তথ্যগুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

শিক্ষার্থীদের এই উদ্বেগের সাথে শিক্ষকদের চিন্তারও অদ্ভুত মিল পাওয়া যাচ্ছে। শ্রেণিকক্ষে এআই ব্যবহারের সমর্থন শিক্ষকদের মাঝে ক্রমশ তলানির দিকে যাচ্ছে। এই বসন্তে এসে দেখা যাচ্ছে, ৫৫ শতাংশ শিক্ষকই ক্লাসে এআই ব্যবহারের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন, যেখানে পক্ষে আছেন মাত্র ৩৮ শতাংশ। গত শরতেও প্রায় অর্ধেক শিক্ষক এর পক্ষে ছিলেন, অর্থাৎ মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানেই সমর্থন কমেছে প্রায় ৮ পয়েন্ট। শিক্ষার্থীদের অ্যাসাইনমেন্ট বা স্কুলের কাজে এআইয়ের সাহায্য নেওয়ার ব্যাপারেও শিক্ষকরা প্রবল আপত্তি জানাচ্ছেন। প্রায় ৬৫ শতাংশ শিক্ষক এর ঘোর বিরোধী। স্কুল বছরের শুরুতেও এই বিরোধিতার হার ছিল ৫৭ শতাংশ, যা সময়ের সাথে সাথে আরও বেড়েছে।

হঠাৎ করে শিক্ষকদের এই মত বদলানোর কারণ খুব সম্ভবত তাদের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা। তারা খুব কাছ থেকে দেখছেন এআই কীভাবে শিক্ষার্থীদের শেখার প্রক্রিয়ায় প্রভাব ফেলছে। প্রায় ৪২ শতাংশ শিক্ষক চলতি বছর তাদের শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় এআইয়ের প্রভাব নিয়ে চরম মাত্রায় উদ্বিগ্ন। আরও ৩৩ শতাংশ শিক্ষকও এ নিয়ে কিছুটা চিন্তিত। অর্থাৎ, মাত্র ২১ শতাংশ শিক্ষক এআই নিয়ে কোনো দুশ্চিন্তা করছেন না।

স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে যদি আরেকটু বড় পরিসরে ভাবি, তাহলে সমাজ জীবনে এআইয়ের ভবিষ্যৎ প্রভাব নিয়েও শিক্ষকদের অবস্থান বেশ নেতিবাচক। ৫১ শতাংশ শিক্ষকই সমাজের ওপর এআইয়ের প্রভাব নিয়ে চরম উদ্বিগ্ন, যা গত শরতের চেয়েও পাঁচ পয়েন্ট বেশি। মজার ব্যাপার হলো, সাধারণ মানুষ বা অভিভাবকদের তুলনায় শিক্ষকরাই এআই নিয়ে ১০-১৫ শতাংশ বেশি উদ্বেগে ভুগছেন।

গনজাগা ইউনিভার্সিটির সম্মেলন আমাদের একটা আদর্শ পৃথিবীর স্বপ্ন দেখায়, যেখানে এআই আর মানুষের নৈতিকতার একটা সুন্দর ভারসাম্য থাকবে। কিন্তু শ্রেণিকক্ষের পরিসংখ্যান আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে, সেই ভারসাম্য অর্জন করাটা মোটেও সহজ কাজ নয়। প্রযুক্তি হয়তো আমাদের অনেক হিসেব-নিকেশ সহজ করে দিচ্ছে, কিন্তু দিন শেষে একটা প্রজন্মকে সত্যিকারের ‘মানুষ’ হিসেবে গড়ে তোলার যে সংগ্রাম— সেখানে যন্ত্রের ওপর অন্ধ ভরসা করাটা হয়তো বোকামিই হবে। প্রশ্নটা এখন আর এআই কতটা উন্নত হলো তা নিয়ে নয়, বরং আমরা এই উন্নতির সাথে কতটা মানবিক থাকতে পারলাম, সেটাই আসল।