12 জুন 2026

শিক্ষার ভবিষ্যৎ ও কাঠামোগত বাস্তব: বিশ্বমঞ্চের রূপরেখা বনাম দেশের অন্দরের টানাপোড়েন

আজকের দ্রুত পরিবর্তনশীল দুনিয়ায় শিক্ষার আসল উদ্দেশ্যটা ঠিক কী? স্রেফ ভালো চাকরি পাওয়া, নাকি একটা সুস্থ সমাজ তৈরি করা? ২০২৬ সালের ৪-৫ ফেব্রুয়ারি দুবাইয়ে অনুষ্ঠিত ৩৫তম এলেটস ওয়ার্ল্ড এডুকেশন সামিটে ঠিক এই প্রশ্নটাই তুলে ধরেছিলেন ‘এডুকেশন বাই ডিজাইন গ্রুপ’-এর সিইও কুমা ভার্মা। তাঁর মতে, গতানুগতিক ছক ভেঙে শিক্ষাব্যবস্থাকে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। টিকে থাকা বা স্রেফ ইঁদুরদৌড়ে জেতার মানসিকতা থেকে বেরিয়ে শিক্ষার মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত বাচ্চাদের সুস্থ, সুখী এবং স্বাবলম্বী করে তোলা। এমন একটা পরিমণ্ডল দরকার যেখানে পুঁথিগত বিদ্যার পাশাপাশি শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য সমান গুরুত্ব পাবে।

এখনকার দিনে স্থূলতা বা মানসিক অবসাদের মতো সমস্যাগুলো যে হারে বাড়ছে, তাতে সিলেবাসের গভীরে হেলথ লিটারেসি বা স্বাস্থ্য সচেতনতা গেঁথে দেওয়া ছাড়া উপায় নেই। আগামী দিনের কর্মজগত কেমন হবে, তা আমরা কেউই নিশ্চিত করে জানি না। তাই শুধু মুখস্থবিদ্যার ওপর জোর না দিয়ে শিক্ষার্থীদের মনোযোগ নিয়ন্ত্রণ, সময় ব্যবস্থাপনা এবং যোগাযোগের মতো বুনিয়াদি দক্ষতাগুলো শেখাতে হবে। আর এখানেই বড় ভূমিকা নিতে পারে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা এআই। এআই ব্যবহার করে শিক্ষাকে প্রত্যেক পড়ুয়ার ব্যক্তিগত প্রয়োজন ও গতি অনুযায়ী সাজানো সম্ভব। ভার্মার কথায়, একটা ‘অ্যাডাপ্টিভ এডুকেশনাল অপারেটিং সিস্টেম’ তৈরি করা দরকার, যা একঘেয়ে ক্লাসরুমের চার দেওয়ালের বাইরে বেরিয়ে সারাজীবন ধরে শেখার সুযোগ করে দেবে। পুরোনো মডেল আঁকড়ে ধরে বসে থাকলে চলবে না, শিক্ষাকে হতে হবে অনেক বেশি নমনীয়।

দুবাইয়ের মঞ্চে যখন শিক্ষার এই নমনীয়তা এবং আধুনিকীকরণের কথা হচ্ছে, তখন ভারতের মাটিতে ছবিটা একটু অন্যরকম। আধুনিক পরিকাঠামো বা এআই-এর স্বপ্ন বাস্তবায়িত করতে গেলে সবার আগে দরকার পর্যাপ্ত তহবিল। কিন্তু সেখানেই বারবার মাথাচাড়া দিচ্ছে কাঠামোগত ও রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব। সম্প্রতি নয়াদিল্লিতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সভাপতিত্বে আয়োজিত নীতি আয়োগের ১১তম গভর্নিং কাউন্সিলের বৈঠকে তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী সি. জোসেফ বিজয় ঠিক এই জায়গাটাতেই সরব হয়েছেন।

মুখ্যমন্ত্রী বিজয় স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, রাজ্যকে তাদের প্রাপ্য ৩,২৮৪ কোটি টাকার শিক্ষা তহবিল অবিলম্বে মেটাতে হবে। আর সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, এই টাকা দেওয়ার ক্ষেত্রে জাতীয় শিক্ষানীতি (NEP 2020) বা ত্রিভাষিক সূত্র চাপিয়ে দেওয়ার মতো কোনো শর্ত মানা চলবে না। ভার্মা যেখানে শিক্ষার ক্ষেত্রে একটা নমনীয় কাঠামোর কথা বলছিলেন, বিজয়ের দাবিটাও বাস্তবে তারই একটা রাজনৈতিক প্রতিফলন। শিক্ষাক্ষেত্রে তামিলনাড়ু এমনিতেই যথেষ্ট উন্নতি করেছে এবং তাদের নিজস্ব দ্বিভাষিক মডেলেই রাজ্যে সাক্ষরতা, উচ্চশিক্ষা আর মানব উন্নয়নের গ্রাফ বেশ ওপরের দিকে। তাই একটা সফল মডেলে জোর করে উপর থেকে নতুন কোনো নীতি চাপিয়ে দেওয়াটা অর্থহীন। শিক্ষা একটা সাংবিধানিক দায়িত্ব, নীতির দোহাই দিয়ে এর জন্য বরাদ্দ অর্থ আটকে রাখা যায় না।

শুধু শিক্ষা নয়, যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোয় রাজ্যের অধিকার আর আর্থিক বন্টন নিয়েও এদিন বেশ কিছু অকাট্য যুক্তি দিয়েছেন বিজয়। যে রাজ্যগুলো আর্থিক শৃঙ্খলা বজায় রেখেছে এবং জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে সফল হয়েছে, তাদের তো উল্টে পুরস্কৃত করা উচিত। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, উন্নয়নমূলক কাজের জন্যই দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলোকে কেন্দ্রীয় বরাদ্দ বা সংসদীয় প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার হতে হচ্ছে। নিজের রাজ্যের সংস্কৃতির কথা মাথায় রেখে তিনি এদিন কবি-সন্ত তিরুবল্লুবরের লেখা কালজয়ী তামিল সাহিত্য ‘তিরুক্কুরাল’-কে ভারতের জাতীয় সাহিত্যের স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি তোলেন। এর সার্বজনীন আবেদন কোনো ভাষা বা নির্দিষ্ট অঞ্চলের গণ্ডিতে আটকে নেই।

শিক্ষার বৃহত্তর পরিসর শুধু ক্লাসরুমেই সীমাবদ্ধ থাকে না, সমাজের প্রান্তিক মানুষের বেঁচে থাকার লড়াইটাও এর একটা অবিচ্ছেদ্য অংশ। সেই জায়গা থেকেই প্রতিবেশী দেশগুলোর হাতে বন্দি তামিল মৎস্যজীবীদের প্রসঙ্গ টেনে আনেন তিনি। শ্রীলঙ্কা এবং পাকিস্তানে আটকে থাকা হাজার হাজার ভারতীয় মৎস্যজীবী ও তাদের ট্রলারগুলোকে নিরাপদে ফিরিয়ে আনতে কেন্দ্রকে দ্রুত কূটনৈতিক পদক্ষেপ নিতে অনুরোধ করেছেন মুখ্যমন্ত্রী।

দিনশেষে, প্রযুক্তির হাত ধরে শিক্ষার আধুনিকীকরণের স্বপ্ন আর যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোয় রাজ্যের নিজস্ব অধিকার টিকিয়ে রাখার এই যে সমান্তরাল লড়াই, এর কোনো সহজ বা রৈখিক সমাধান নেই। একদিকে বিশ্বের দরবারে উঠে আসছে ভবিষ্যতের শিক্ষার এক আদর্শ রূপরেখা, অন্যদিকে দেশের ভেতরে চলছে সেই রূপরেখা গড়ার রসদ জোগাড়ের কাঠামোগত সংগ্রাম। একটা সুস্থ, স্বাবলম্বী ভবিষ্যৎ গড়তে গেলে এই জটিল সমীকরণগুলো শেষ পর্যন্ত কীভাবে মিলবে, তা হয়তো সময়ই বলবে।