12 জুন 2026

কুইন্স ক্লাবের সবুজ ঘাসে আলো-আঁধারি: সেরেনার অসমাপ্ত প্রত্যাবর্তনের মাঝেই আমান্ডার দাপট, আর হোলগারের দীর্ঘশ্বাস

টেনিস সার্কিটে ঘাসের কোর্টের মরসুম মানেই যেন এক অদ্ভুত রোমাঞ্চ, আর সেই সঙ্গে পদে পদে লুকিয়ে থাকা বিপদের হাতছানি। কুইন্স ক্লাবে এই সপ্তাহে ঠিক এমন একটা দৃশ্যই ফুটে উঠল। ৪৪ বছর বয়সে চার বছরের দীর্ঘ বিরতি কাটিয়ে সেরেনা উইলিয়ামস যখন কোর্টে ফিরলেন, গোটা টেনিস বিশ্ব যেন নড়েচড়ে বসেছিল। ভিক্টোরিয়া এমবোকোকে সঙ্গী করে ডাবলসে নিকোল মেলিচার মার্টিনেজ এবং এরিন রুটলিফ জুটির বিরুদ্ধে ৭-৬(২), ৬-২ সেটের দুর্দান্ত জয়ে সেই প্রত্যাবর্তনের শুরুটাও হয়েছিল রূপকথার মতো। কিন্তু ঘাসের কোর্ট যে কতটা নির্দয় হতে পারে, সেটা টের পেতে বেশি সময় লাগল না।

কুইন্সের কোর্টগুলো তাদের অনবদ্য কোয়ালিটির জন্য বিখ্যাত হলেও, টুর্নামেন্টের শুরুর দিকে এখানকার ঘাস মারাত্মক রকমের স্লিক বা পিচ্ছিল থাকে। ঠিক এই জায়গাতেই বড়সড় মাশুল গুনতে হলো এমবোকোকে। ক্যারোলিনা প্লিসকোভার বিরুদ্ধে সিঙ্গলস ম্যাচে প্রথম সেট হারার পর দ্বিতীয় সেটে ব্রেক পয়েন্ট পেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু আচমকাই ভুল পদক্ষেপে ঘাসে পা পিছলে মারাত্মকভাবে পড়ে যান এই তরুণী। সঙ্গে সঙ্গে বাঁ হাঁটু চেপে ধরেন, আর ম্যাচ থেকে ছিটকে যাওয়া ছাড়া কোনো উপায় ছিল না তার সামনে। এর ফলে লেইলা ফার্নান্দেজ ও লরা সিগেমুন্ডের বিরুদ্ধে সেরেনাদের বৃহস্পতিবারের ডাবলস ম্যাচটাও স্বাভাবিকভাবেই বাতিল হয়ে যায়।

সেরেনা আপাতত বার্লিনে ওয়াইল্ডকার্ড এন্ট্রির দিকে তাকিয়ে আছেন। আগামী সপ্তাহে উইম্বলডনের ওয়াইল্ডকার্ড ঘোষণাতেও হয়তো তার নামটা দেখা যাবে। অল ইংল্যান্ড লন টেনিস ক্লাবের প্রধান স্যালি বোল্টন তো সেরেনাকে ঘিরে দর্শকদের উন্মাদনা দেখে রীতিমতো উচ্ছ্বসিত, আর তাকে উইম্বলডনে দেখার সম্ভাবনা নিয়ে একটা ফিসফাসও চলছে। তবে এমবোকোর মতো প্রতিভাবান এক খেলোয়াড়ের ভবিষ্যৎ এই মুহূর্তে ইনজুরির কালো মেঘে ঢাকা।

ইনজুরি জিনিসটা যেকোনো অ্যাথলিটের জন্যই একটা দুঃস্বপ্ন, আর হোলগার রুনের চেয়ে ভালো এটা এখন আর কে বুঝবে! কুইন্স ক্লাবে যখন একের পর এক রোমাঞ্চকর ম্যাচ গড়াচ্ছে, ড্যানিশ এই তরুণ তখন কোর্টের বাইরে বসেই দিন গুনছেন। গত বছরের অর্থাৎ ২০২৫ সালের অক্টোবরে স্টকহোম ওপেনের সেমিফাইনালে বাঁ পায়ের অ্যাকিলিস টেন্ডন ছিঁড়ে যাওয়ার পর থেকে প্রতিযোগিতামূলক টেনিসের বাইরে তিনি। অনেকেই ভেবেছিলেন অন্তত ঘাসের কোর্টের এই মরসুমে তাকে দেখা যাবে। দোহা এবং মন্টে কার্লোতে দীর্ঘ রিহ্যাব চললেও, প্রাক্তন বিশ্ব নম্বার ফোর এখনই কোর্টে ফেরার ঝুঁকি নিচ্ছেন না। উইম্বলডন খেলার একটা ক্ষীণ সম্ভাবনা তিনি জিইয়ে রাখলেও, সাত মাস কোর্টের বাইরে থাকার পর সেটা আক্ষরিক অর্থেই জুয়া খেলার মতো হয়ে যাবে।

তার চেয়ে বরং উত্তর আমেরিকার হার্ড-কোর্ট সুইংয়ে ফেরার ভাবনাটাই বেশি বাস্তবসম্মত বলে মনে হচ্ছে। নিজের ফিটনেস নিয়ে বিন্দুমাত্র আপস করতে নারাজ এই ২৩ বছর বয়সী তরুণ। শুধু র‍্যাঙ্কিং পড়ে যাচ্ছে বলে তাড়াহুড়ো করে ফিরে এসে আরেকটা বড় ইনজুরিতে পড়ার কোনো মানে হয় না। হোলগার আর তার টিমের কাছে দীর্ঘমেয়াদী সুস্থতাটাই এখন আসল, আর সে কারণেই ফেরার এই দীর্ঘ প্রতীক্ষা।

তবে ঘাসের কোর্টের এই শারীরিক ধকল আর ইনজুরির ভয়ের মধ্যেও কিন্তু কেউ কেউ ঠিকই নিজের জমি শক্ত করে নিচ্ছেন। যেমন আমান্ডা অ্যানিসিমোভা। এই কোর্টের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়াটা যে কতটা যন্ত্রণাদায়ক, সেটা তিনি নিজেই অকপটে স্বীকার করেছেন। ২৫-এর উইম্বলডন রানার-আপ বলছিলেন, “ব্যাপারটা বেশ মজার। ঘাসে প্র্যাকটিসের প্রথম কয়েকটা দিন জাস্ট জঘন্য কাটে। পায়ে সাংঘাতিক ব্যথা হয়। মনে হয়, হে ঈশ্বর, এটা বড্ড কঠিন!”

কিন্তু ওই যে, একবার রিদম পেয়ে গেলে আর তাকে রোখে কে! টুর্নামেন্টের দ্বিতীয় বাছাই আমান্ডা প্রথম রাউন্ডে বাই পেয়েছিলেন। এরপর কোর্টে নেমে সরাসরি শেষ ষোলোর লড়াইয়ে বিশ্ব র‍্যাঙ্কিংয়ের ৪৪ নম্বর লরা সিগেমুন্ডকে ৬-১, ৬-৩ গেমে রীতিমতো উড়িয়ে দিয়েছেন। ম্যাচের প্রথম গেমটায় একটু নড়বড়ে লাগলেও সিগেমুন্ডের ব্রেক পয়েন্ট সেভ করার পর টানা সাতটা গেম জিতে নেন এই আমেরিকান। দ্বিতীয় সেটে নিজের সার্ভে একটাও ব্রেক পয়েন্টের মুখোমুখি হননি। নিজের গেমস্টাইল নিয়ে বেশ আত্মবিশ্বাসী আমান্ডা এখন চেষ্টা করছেন বেশি করে নেটে ওঠার। সেমিফাইনালে জায়গা করে নেওয়ার জন্য তার পরবর্তী লড়াই স্বদেশী ইভা জোভিকের বিরুদ্ধে, যিনি আলেকজান্দ্রা ইয়ালাকে ৬-২, ৬-২ ব্যবধানে হারিয়ে দুরন্ত ফর্মে রয়েছেন। কুইন্স ক্লাবের এই রোলারকোস্টার টুর্নামেন্টে শেষ পর্যন্ত ঘাসের কোর্ট কার মুখে হাসি ফোটায়, সেটাই এখন দেখার।