অস্ট্রেলিয়াকে চুনকাম করার আনন্দটা বোধহয় পুরোপুরি তারিয়ে উপভোগ করতে পারলেন না সলমন আলি আঘা। টি-টোয়েন্টি সিরিজের ট্রফি হাতে তোলার পরপরই পাকিস্তান অধিনায়ক জানতে পারেন, দেশের সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে আসন্ন বিশ্বকাপে ভারতের বিরুদ্ধে তারা খেলবে না। স্বভাবতই সিরিজ শেষের সাংবাদিক বৈঠকে এই নিয়ে প্রশ্ন উড়ে আসে। সলমন বেশ অসহায়ভাবেই ব্যাপারটা মেনে নিয়েছেন। তাঁর কথায়, “আমাদের তো বিশ্বকাপে খেলতে যাওয়ার কথা, কিন্তু সত্যি বলতে, এই বিষয়ে আমাদের হাতে কিচ্ছু নেই। সরকার আর পিসিবি চেয়ারম্যান যা বলবেন, আমাদের মুখ বুজে সেটাই করতে হবে।” শাহবাজ শরিফ সরকার নিজেদের অবস্থানে অনড় থাকলে ১৫ ফেব্রুয়ারি শ্রীলঙ্কায় ভারত-পাক মহারণ বিশ বাঁও জলেই থাকছে।
রবিবার অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপে ভারত-পাকিস্তান ম্যাচের মাঝেই এক্স হ্যান্ডেলে এই অভাবনীয় ঘোষণা করে পাকিস্তান সরকার। তারা স্পষ্ট জানিয়েছে, দলকে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে অংশ নেওয়ার অনুমতি দেওয়া হলেও ১৫ ফেব্রুয়ারি ভারতের বিরুদ্ধে মাঠে নামা চলবে না। গ্রুপ এ-তে আমেরিকা, নেদারল্যান্ডস ও নামিবিয়ার বিরুদ্ধে খেললেও ভারতের মুখোমুখি হবে না পাকিস্তান। ব্যাপারটা আসলে একদিনে এই জায়গায় পৌঁছায়নি। এর বীজ পোঁতা হয়েছিল গত বছর চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে। ভারত পাকিস্তানে গিয়ে খেলতে অস্বীকার করায় ম্যাচগুলো সংযুক্ত আরব আমিরশাহিতে সরে যায়। তখন আইসিসি এটাও জানিয়েছিল যে ২০২৬ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপেও পাকিস্তান ভারতে খেলবে না, তাই ওই টুর্নামেন্টে তাদের ম্যাচগুলো শ্রীলঙ্কায় রাখা হয়। বাংলাদেশকে বিশ্বকাপ থেকে ছেঁটে ফেলার পর পাকিস্তান পুরো টুর্নামেন্ট বয়কটের হুমকি দিলেও, শেষমেশ শুধু ভারত-ম্যাচ বয়কটের পথেই হাঁটল তারা। সম্ভবত পুরোপুরি না খেললে নির্বাসনের যে খাঁড়া ঝুলত, সেটা এড়াতেই পিসিবি-র এই আংশিক বয়কটের কৌশল। কিন্তু এরপরেও পয়েন্ট কাটা বা অন্য কড়া শাস্তির মুখে পড়তে হতে পারে তাদের। এখন জয় শাহের নেতৃত্বাধীন আইসিসি কী পদক্ষেপ নেয়, নজর থাকবে সেদিকেই।
মাঠের বাইরের এই রাজনৈতিক ডামাডোলের ঠিক উল্টো ছবিটা কিন্তু ভারতীয় শিবিরে। সেখানে দলের অন্দরমহলের সমীকরণটা একেবারেই আলাদা, যাকে বলে রীতিমতো মধুর সমস্যা। একদিকে আয়ারল্যান্ড আর ইংল্যান্ড সিরিজের জন্য ভারতের সাজসাজ রব, অন্যদিকে ১৫ বছরের এক বিস্ময় বালককে নিয়ে সবার মনে হাজারো প্রশ্ন। সদ্য সমাপ্ত আইপিএলে রীতিমতো তাণ্ডব চালিয়ে অরেঞ্জ ক্যাপ, মোস্ট ভ্যালুয়েবল প্লেয়ার, ইমার্জিং প্লেয়ার এবং সুপার স্ট্রাইকার-সহ একগাদা পুরস্কার বগলদাবা করে জাতীয় দলে ডাক পেয়েছিল বৈভব সূর্যবংশী। ২৩৭.৩০ স্ট্রাইক রেটে রান করা এই বাঁহাতি ওপেনার আয়ারল্যান্ডের পর ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে প্রথম টি-টোয়েন্টিতেও প্রথম একাদশের বাইরেই থেকে গেল।
কেন এই উঠতি প্রতিভাকে সাইডলাইনে বসিয়ে রাখা হচ্ছে, তার একটা পরিষ্কার ব্যাখ্যা দিয়েছেন ভারতের টি-টোয়েন্টি অধিনায়ক শ্রেয়স আইয়ার। সদ্য বিশ্বকাপজয়ী দলের ধারাবাহিকতা আর ব্যালেন্স নষ্ট করতে নারাজ টিম ম্যানেজমেন্ট। দলের ওপেনিংয়ে এখন অভিষেক শর্মা আর সঞ্জু স্যামসনের মতো পরীক্ষিত তারকারা রয়েছেন। অভিষেকের স্ট্রাইক রেট ১৯৩.২৫ (৪৯ ম্যাচে ১৫৪৬ রান), আর সঞ্জু তো ২০২৬ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জয়ে, বিশেষ করে নকআউট ম্যাচগুলোতে অন্যতম বড় কারিগর ছিলেন। তাঁর ঝুলিতে আছে ১৫৫.৪২ স্ট্রাইক রেটে ১৪০৫ রান। এর পাশাপাশি ভুলে গেলে চলবে না, ঈশান কিষাণও এখন বিশ্বের এক নম্বর টি-টোয়েন্টি ব্যাটার। শ্রেয়স বেশ যুক্তিবাদী সুরেই বলেছেন, “দলের সবাই পারফর্ম করেছে। আত্মবিশ্বাস ধরে রাখাটা জরুরি। বিশেষ করে যারা বিশ্বকাপ জিততে সাহায্য করেছে, এই ফর্ম্যাটটা বোঝে, তাদের পাশে থাকাটা দলের কর্তব্য।”
ব্যাটিং কোচ সীতাংশু কোটাকও অধিনায়কের সুরেই সুর মিলিয়েছেন। তিনি মনে করেন, শুধুমাত্র নতুন কাউকে সুযোগ দেওয়ার জন্য নিয়মিত রান পাওয়া ব্যাটারদের বসিয়ে দেওয়াটা দলের জন্য মোটেও স্বাস্থ্যকর নয়। তবে বৈভবকে নিয়ে দলের যে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা রয়েছে, সেটা শ্রেয়সের কথাতেই স্পষ্ট। তিনি স্বীকার করেছেন ছেলেটি অভাবনীয় প্রতিভাবান এবং সময় এলে সে ঠিকই নিজের জাত চেনাবে। আপাতত দলের রণনীতি বা টিম কম্বিনেশন নিয়ে কাটাছেঁড়াটা ড্রেসিংরুমের চার দেয়ালের ভেতরেই গোপন রাখতে চাইছেন অধিনায়ক।
সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের বর্তমান চালচিত্রটা বেশ অদ্ভুত। একদল যেখানে সরকারি ফতোয়ায় চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীর বিরুদ্ধে মাঠে নামতে অস্বীকার করে খেলাটাকে রাজনীতির আখড়া বানিয়ে তুলেছে, অন্যদল তখন নিজেদের বেঞ্চ স্ট্রেংথ নিয়ে এতটাই নিশ্চিন্ত যে ১৫ বছরের এক সম্ভাব্য মহাতারকাকে সুযোগের অপেক্ষায় রাখতে তাদের দু’বার ভাবতে হচ্ছে না।
More Stories
রাজনীতি বনাম ২২ গজ: একদিকে ভারত-পাক ম্যাচের মেঘ, অন্যদিকে সূর্যংশের স্বপ্নের উড়ান
কুইন্স ক্লাবের অভাবনীয় সাফল্য এবং উইম্বলডনে সেরেনার রাজকীয় প্রত্যাবর্তন
জিম্মি জনসন, জেমি ম্যাকমারে নৌ ঘাঁটিতে ন্যাসকার ট্রাক সিরিজ রেসের মূল আকর্ষণে