এশিয়ার বাজারে সোনার সেই পুরনো জৌলুস যেন কিছুটা ম্লান হতে শুরু করেছে। একদিকে ইরানের যুদ্ধের জেরে হু হু করে বাড়ছে তেলের দাম, আর তার সাথেই পাল্লা দিয়ে কমছে সুদের হার কমার আশা। একটা সময় যে সোনার দাম রকেটের গতিতে ছুটছিল, এখন সেই বাজারেই যেন স্পষ্ট ভাটার টান। তেলের দাম বাড়া মানেই মূল্যস্ফীতির পুরনো জুজু ফিরে আসা। আর এই মূল্যবৃদ্ধির ভয়েই কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সুদের হার কমানোর পথে হাঁটতে চাইছে না। সোজা কথায়, বাজারে যখন অন্যান্য সুদের হার যুক্ত বিনিয়োগে ভালো রিটার্ন মিলছে, তখন সোনার দিকে সাধারণ মানুষের ঝোঁক কমবেই।
পরিসংখ্যানের দিকে তাকালেই বাজারের এই মুড সুইং বিষয়টা পরিষ্কার হয়ে যাবে। গত ২৭ ফেব্রুয়ারি সোনার দাম ছিল প্রতি ট্রয় আউন্স ৫,২৪৭.৯০ মার্কিন ডলার, সেখান থেকে ১২ শতাংশ পতন হয়ে শুক্রবার সকালে তা ঠেকেছে ৪,৬২০ ডলারে। অথচ এই সোনাকেই আমরা বরাবর দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগ আর অর্থনৈতিক সংকটের সময় সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয় বলে জেনে এসেছি। কিটকো-র তথ্য বলছে, গত ২৮ জানুয়ারি সোনার দাম সর্বকালের সর্বোচ্চ ৫,৬০২ ডলারে পৌঁছেছিল। তার আগের বছর ২ জানুয়ারি ২,৬২৪ ডলার থেকে লাফিয়ে ৩১ ডিসেম্বর ৪,৩৩৯.৬৫ ডলারে পৌঁছেছিল, যা প্রায় ৬৫ শতাংশ বৃদ্ধি! কিন্তু এখন চিত্রটা ভিন্ন। ব্রেন্ট ক্রুডের জুলাই ফিউচার্স প্রায় এক শতাংশ বেড়ে শুক্রবার ১১১.৪১ ডলারে দাঁড়িয়েছে। টানা চার মাস ধরে এই তেলের দাম ঊর্ধ্বমুখী। জুনের চুক্তিতে তো ব্যারেল প্রতি দাম ১২৬.৪১ ডলারে পৌঁছে গেছিল, যা মার্চ ২০২২-এর পর সর্বোচ্চ।
বুধবার মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভ সুদের হার অপরিবর্তিত রেখেছে ঠিকই, কিন্তু মূল্যস্ফীতি নিয়ে তাদের কপালে চিন্তার ভাঁজ স্পষ্ট। পরের দিন ব্যাঙ্ক অফ ইংল্যান্ডও একই রাস্তায় হেঁটেছে। তারা ইরানের যুদ্ধের সম্ভাব্য অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে রীতিমতো শঙ্কিত, দরকার পড়লে ঋণ নেওয়ার খরচ জোরদারভাবে বাড়িয়ে দেওয়ার একটা রূপরেখাও তারা তৈরি রেখেছে। কমট্রেঞ্জ রিসার্চের প্রতিষ্ঠাতা জ্ঞানশেখর ত্যাগরাজন যেমনটা বলছিলেন, সোনার দাম হয়তো এখান থেকে খুব বেশি পড়বে না, কিন্তু জ্বালানির এই চড়া দাম বাজারের মোটেই কোনো উপকার করছে না। সুদের হার না কমলে সোনার দাম বাড়ার কোনো জাদুকরী রাস্তা নেই। এশিয়ার বিনিয়োগকারীদের একটা মানসিকতা হলো, দাম যখন বাড়ে তখন তারা হুড়মুড়িয়ে সোনা কেনেন। এই মন্দার বাজারে পকেট থেকে টাকা বের করে সোনা কেনার লোক হাতেগোনা। খোদ ভারতে ১৯ এপ্রিলের অক্ষয় তৃতীয়ার মতো বড় পর্বেও বাজারে সেই চিরাচরিত কেনাকাটার উন্মাদনা চোখে পড়েনি।
খুচরো বাজারে এই হতাশার উল্টোদিকে কিন্তু এক অন্য ছবি তৈরি হচ্ছে। ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের মতে, গত বছর বিশ্বজুড়ে বিক্রি হওয়া সোনার প্রায় ৭০ শতাংশই কিনেছে এশিয়ার দেশগুলো, যার শীর্ষে রয়েছে ভারত আর চিন। প্রথম প্রান্তিকে বিশ্বব্যাপী সোনার চাহিদা দুই শতাংশ বেড়ে ১,২৩১ টনে দাঁড়িয়েছে। দাম চড়া থাকায় এই সময়ে সোনা কেনার মোট মূল্য ৭৪ শতাংশ বেড়ে রেকর্ড ১৯৩ বিলিয়ন ডলার ছুঁয়েছে। আর এখানেই আসল চমকটা দিচ্ছে ভারতের রিজার্ভ ব্যাংক। সাধারণ বিনিয়োগকারীরা যখন পিছু হটছে, আরবিআই তখন নিঃশব্দে নিজেদের সোনার ভাণ্ডার ভরিয়ে তুলছে।
আরবিআই-এর সাম্প্রতিক ষাণ্মাসিক রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরের শেষে যেখানে দেশের ফরেক্স রিজার্ভ বা বিদেশি মুদ্রার ভাণ্ডারে সোনার ভাগ ছিল ১৩.৯২ শতাংশ, ২০২৬ সালের মার্চের শেষে তা এক ধাক্কায় বেড়ে হয়েছে ১৬.৭ শতাংশ। অথচ এই একই সময়ে দেশের সামগ্রিক বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৭০০.০৯ বিলিয়ন ডলার থেকে কিছুটা কমে ৬৯১.১১ বিলিয়ন ডলার হয়েছে। রিজার্ভের পরিমাণ কমলেও তাতে সোনার দাম বেড়ে যাওয়ায় সার্বিক হিসেবটা শক্তপোক্তই আছে।
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো এই সোনা জমানোর ক্ষেত্রে একটা বড়সড় দেশীয় নীতি বা ‘ঘর ওয়াপসি’ দেখা যাচ্ছে। আরবিআই-এর হাতে ২০২৬ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত মোট ৮৮০.৫২ মেট্রিক টন সোনা রয়েছে, যার মধ্যে দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি, অর্থাৎ ৬৮০.০৫ মেট্রিক টনই রাখা আছে দেশের মাটিতে। অথচ ২০২৪ সালের মার্চেও এই হিসেবটা ছিল অর্ধেকের কম। গত দুই বছরে বিদেশ থেকে প্রচুর পরিমাণ সোনা দেশে ফিরিয়ে এনেছে ভারত। বিশ্বজুড়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো নিজেদের রিজার্ভকে বৈচিত্র্যময় করতে সোনার উপর যেভাবে ভরসা রাখছে, আরবিআই-এর এই পদক্ষেপ তারই একটা সুপরিকল্পিত অংশ। একদিকে ডিসেম্বরের শেষে আমদানির কভার দাঁড়িয়েছে ১০.৮ মাসে, অন্যদিকে রিজার্ভের অনুপাতে উদ্বায়ী মূলধন প্রবাহ বা ভোলাটাইল ক্যাপিটাল ফ্লো সেপ্টেম্বরের ৬৬.১ শতাংশ থেকে বেড়ে ডিসেম্বরের শেষে ৬৯.১ শতাংশে এবং স্বল্পমেয়াদী ঋণ ১৯.৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ২১.৯ শতাংশে পৌঁছেছে। এই ধরনের অর্থনৈতিক টানাপোড়েন আর অস্থিরতার মধ্যে, সাধারণ মানুষ তেলের দামে পুড়লেও, দেশের অর্থনীতিকে মজবুত রাখতে সোনাতেই নিজেদের শেষ ভরসা খুঁজছে শীর্ষ ব্যাংক।
More Stories
রেল পরিষেবায় জোড়া উদ্যোগ: শিয়ালদহে সেতু সংস্কারের মেগা ব্লক, পুণেতে বাতিল কোচে রেস্তোরাঁ
বিশ্বজুড়ে স্বর্ণের বাজারে বড় ধস: শক্তিশালী ডলার ও ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার প্রভাব
গুগল ইকোসিস্টেমে বড় রদবদল: স্ট্রিট ভিউ অ্যাপ বন্ধের পাশাপাশি ক্লাউড পরিষেবায় নতুন গতি