30 এপ্রিল 2026

শিক্ষার দুই মেরু: ‘বেটি বাঁচাও’-এর বিজ্ঞাপনে যখন স্কুলছুট বাড়ছে, শহরের স্কুলে তখন উদ্‌যাপন

গ্রামের মেঠো পথ পেরিয়ে মেয়েটার স্কুলে যাওয়ার স্বপ্নটা ক্রমশ ফিকে হয়ে আসছে। সমস্যার সমাধানের রাস্তাটা যেন আক্ষরিক অর্থেই উল্টো পথে হাঁটছে আজকাল। একদিকে সরকারি ফতোয়া—যেসব স্কুলে পড়ুয়ার সংখ্যা পঞ্চাশের নীচে নেমে যাচ্ছে, সেগুলোকে এক ধাক্কায় কাছাকাছি অন্য কোনও স্কুলের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হবে। ফলত, বাড়ির কাছের চেনা স্কুলটার ঝাঁপ বন্ধ হচ্ছে। মেয়েদের জন্য দূরের অচেনা রাস্তায় অনেকটা পথ হেঁটে স্কুলে যাওয়ার ঝুঁকি নেওয়াটা সব গ্রামীণ পরিবারের পক্ষে সম্ভব হয় না, আর তার অনিবার্য পরিণতি হিসেবে বাড়ছে স্কুলছুটের সংখ্যা।

অথচ, দেশজুড়ে প্রধানমন্ত্রীর সাধের ‘বেটি বাঁচাও, বেটি পড়াও’ স্লোগানের তুমুল হইচই। এই বিজ্ঞাপনী চমকের আড়ালে লুকিয়ে থাকা বাস্তবটা কিন্তু রীতিমতো শিউরে ওঠার মতো। খোদ নারী ও শিশু উন্নয়ন প্রতিমন্ত্রীর দেওয়া পরিসংখ্যানই চোখে আঙুল দিয়ে দেখাচ্ছে, গত পাঁচ বছরে দেশে ৬৫.৭ লক্ষ শিশু মাঝপথেই পড়াশোনা ছেড়েছে। এর মধ্যে প্রায় অর্ধেক, অর্থাৎ ২৯.৮ লক্ষই মেয়ে। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হল গুজরাতের মতো তথাকথিত ‘উন্নত’ রাজ্যের হাল। ২০২৪ সালেও যেখানে স্কুলছুট ছিল ৫৪,৫৪১ জন, ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষে সেটাই এক লাফে বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২.৪ লক্ষে! যার মধ্যে ১.১ লক্ষই কন্যাশিশু। মাত্র এক বছরে এই বিপুল বৃদ্ধি রীতিমতো ভিরমি খাওয়ার মতো ব্যাপার। এই তালিকার ঠিক পরেই রয়েছে অসম, যেখানে দেড় লক্ষ স্কুলছুট এবং তার মধ্যে ৫৭ হাজার মেয়ে। উত্তরপ্রদেশে ৯৯ হাজার স্কুলছুট শিশুর মধ্যে ৫৬ হাজারই মেয়ে। কেন্দ্রের শাসকদল কথায় কথায় উন্নয়নের ক্ষেত্রে ‘ডবল ইঞ্জিন সরকার’-এর বড়াই করলেও, অদ্ভুত এক সমাপতনে স্কুলছুটের নিরিখে প্রথম তিনটে স্থানেই জ্বলজ্বল করছে বিজেপি-শাসিত রাজ্যগুলো।

শহরের বুকে অন্য ভারত, যেখানে মেধার উদ্‌যাপন

এবার এই ছবিটার ঠিক উল্টো পিঠে একটু চোখ রাখা যাক। গ্রামের স্কুলগুলোর যখন এই বেহাল দশা, তখন শহরের নামি বেসরকারি স্কুলগুলোতে বইছে একেবারে অন্য হাওয়া। সেখানে পড়াশোনার পাশাপাশি প্রতিভা আর সাফল্যের তুমুল উদ্‌যাপন। এই তো সেদিন, বিধান পার্কের মাঠে বসেছিল ক্যালকাটা পাবলিক গ্রুপের স্কুলগুলোর (বিধান পার্ক, কালিকাপুর এবং বারাসত শাখা) এক জমজমাট সাংস্কৃতিক উৎসব। সত্যজিৎ রায়ের অনবদ্য সৃষ্টি ‘ভূতের রাজা’ চরিত্রে অভিনয় করে একাদশ শ্রেণির ছাত্রী সমাদৃতা মুখোপাধ্যায় তো উত্তেজনায় ফুটছিল। তার কাছে এই পারফরম্যান্সটা ছিল একটা অভাবনীয় অভিজ্ঞতা।

বোর্ডের সদস্য আর বিচারকদের প্রদীপ প্রজ্বলনের মাধ্যমে শুরু হওয়া ওই অনুষ্ঠানে কী ছিল না! মঞ্চে এবং মঞ্চের বাইরে ধ্রুপদী থেকে লোকনৃত্য, কনটেম্পোরারি ডান্স, জ্যামিং সেশন, ফ্যাশন শো, এমনকি আগুন ছাড়া রান্নার প্রতিযোগিতাও চলল পুরোদমে। বিধান পার্ক শাখার অধ্যক্ষা প্রতীচী লাহিড়ী সেনগুপ্ত, বারাসতের অধ্যক্ষা অভিলাষা দাস কিম্বা কালিকাপুরের প্রেমা দাস—সবার গলাতেই ছিল ছাত্রছাত্রীদের প্যাশন, শৃঙ্খলা আর আত্মবিশ্বাসের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা। বিমূর্ত ছবি আর মডেল দিয়ে সাজানো বাস্কেটবল কোর্ট থেকে শুরু করে অডিটোরিয়াম—সবটাই জানান দিচ্ছিল, এইসব উৎসব তো শুধু নাচ-গানের নয়, বরং আগামী দিনের নেতৃত্ব, আত্মবিশ্বাস আর টিমওয়ার্ক শেখার একটা বিরাট বড় মঞ্চ।

এক দেশের দুই সমান্তরাল ছবি

একইরকম জমকালো ছবি দেখা গেল বিদ্যা মন্দির অডিটোরিয়ামে, সুশীলা বিড়লা গার্লস স্কুলের বার্ষিক পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে। সেভেন, এইট বা নাইনের মেয়েদের স্বতঃস্ফূর্ত পারফরম্যান্স, দ্য গ্রেটেস্ট শোম্যান-এর ‘দিস ইজ মি’-র মতো গানের সুরে বোনা জটিল হারমনি—সব মিলিয়ে এক অন্য জগত। অধ্যক্ষা কোয়েলি দে যখন বার্ষিক রিপোর্ট পেশ করছেন বা দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্রী পৃথা ভোজনগরওয়ালাকে সেরা সার্বিক পারফরম্যান্সের জন্য উষা জৈন পদক দেওয়া হচ্ছে, তখন স্পষ্ট হয়ে ওঠে শহুরে শিক্ষাব্যবস্থা একটা মেয়েকে কতটা সুযোগ এনে দিতে পারে। সমাজসেবার জন্য নিষ্কিকা সিংভি পুরস্কৃত হচ্ছে, কুশান হাউস তুলে নিচ্ছে সুশীলা বিড়লা মেমোরিয়াল ট্রফি, এমনকি স্কুলের চতুর্থ শ্রেণির কর্মী গীতা দেবীও সেরা কর্মীর সম্মান পাচ্ছেন।

এই দুটো ভিন্ন প্রেক্ষিতকে পাশাপাশি রাখলে ভারতের শিক্ষাব্যবস্থার এক চূড়ান্ত রূপক তৈরি হয়। একই দেশে, একই সময়ে একজন ছাত্রী যখন অডিটোরিয়ামের ঝলমলে আলোয় দাঁড়িয়ে নিজের প্রতিভার স্বীকৃতি নিচ্ছে, ঠিক তখনই হয়তো মাইলের পর মাইল দূরের কোনও গ্রামে আরেকজন ছাত্রী তার বইখাতা গুছিয়ে রাখছে চিরকালের মতো, কারণ তার স্কুলটা অন্য স্কুলের সাথে মার্জ হয়ে গেছে। ডাবল ইঞ্জিন আর বেটি বাঁচাও-এর স্লোগানগুলো শহরের এই হাই-প্রোফাইল ফিয়েস্তার শব্দব্রহ্মে চাপা পড়ে যায়, আর গ্রামের সেই মেয়েটার স্কুলছুট হওয়ার খবরটা পড়ে থাকে নিছকই একটা পরিসংখ্যান হয়ে। শিক্ষার এই দুই ভারত যেন এক সমান্তরাল রেললাইনের মতো, যাদের মধ্যে দূরত্ব কমার কোনও লক্ষণ আপাতত চোখে পড়ছে না।