আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে শান্তি প্রক্রিয়ার অগ্রগতি এবং এশিয়ার শেয়ার বাজারে প্রযুক্তির রমরমা সত্ত্বেও ক্রিপ্টোকারেন্সি মার্কেট যেন কিছুটা গা বাঁচিয়েই চলছে। একজন বাজার বিশ্লেষক হিসেবে এই পরিস্থিতিটা বেশ কৌতূহলোদ্দীপক; যেখানে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ৮০ ডলারের নিচে নেমে গেছে এবং গ্লোবাল মার্কেটগুলোতে একটা ইতিবাচক হাওয়া বইছে, সেখানে বিটকয়েন বেশ কয়েকদিন ধরেই ৬৪,০০০ ডলারের আশেপাশে থমকে আছে। সপ্তাহের হিসেবে বিটকয়েন প্রায় ২ শতাংশ লোকসানে চলছে, আর মিমকয়েনগুলোর অবস্থা তো আরও শোচনীয়। গ্লোবাল ইকুইটির এই তেজি ভাব ক্রিপ্টো বাজারে এসে যেন ধাক্কা খেয়ে ফিরে যাচ্ছে।
কয়েনডেস্ক-এর তথ্য অনুযায়ী, সোমবার বিটকয়েন লেনদেন হচ্ছিল প্রায় ৬৩,৯৯৬ ডলারে, যা তার আগের ২৪ ঘণ্টায় ০.৪% এবং পুরো সপ্তাহের হিসাবে ২.২% কম। বাজারের বাকি অংশের ছবিটাও বেশ অমিল। সোলানা সপ্তাহে ৩.৭% বেড়ে ৭৪ ডলারে পৌঁছেছে এবং ট্রন ২.২% লাভ করেছে, অন্যদিকে ইথার প্রায় ১,৭৩৩ ডলারে স্থবির হয়ে আছে। তবে লোকসানের পাল্লা ভারী হয়েছে অন্য সারির কয়েনগুলোতে—বিএনবি ৪.২% এবং এক্সআরপি ৪.৩% পড়ে ১.১৩ ডলারে ঠেকেছে। ডজকয়েনের অবস্থা সবচেয়ে খারাপ, এটি ৬.৫% খুইয়েছে। এমনকি জুনের শুরুতে ঝড় তোলা হাইপারলিকুইডের ‘হাইপ’ (HYPE) একদিনেই ৫% পড়ে গিয়ে সাপ্তাহিক লাভ মাত্র ১.৯%-এ নামিয়ে এনেছে।
ভূ-রাজনীতির হাওয়া ও বাজারের সমীকরণ
ম্যাক্রো ইকোনমিক বা সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ক্রিপ্টোর পক্ষে অনুকূল হলেও, ডিজিটাল মুদ্রার বাজারে তার কোনো জোরালো প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। ৬০ দিনের মধ্যে একটি চূড়ান্ত শান্তি চুক্তি রূপায়ণের লক্ষ্যে আমেরিকা ও ইরান একটি রোডম্যাপে সম্মত হয়েছে, যার জেরে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ১.৭% কমে ব্যারেল প্রতি প্রায় ৭৯ ডলারে দাঁড়িয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-কে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া উন্মাদনায় ভর করে এশিয়ার প্রযুক্তি শেয়ারগুলোর হাত ধরে এমএসসিআই (MSCI) সূচক ০.৬% বেড়েছে। যদিও মার্কিন ফিউচারস কিছুটা দুর্বল ছিল এবং এসঅ্যান্ডপি ৫০০ কন্ট্রাক্ট ০.৫% নিচে নেমেছিল। ব্লুমবার্গের রিপোর্ট অনুযায়ী, মধ্যস্থতাকারী দেশ কাতার এবং পাকিস্তান এক যৌথ বিবৃতিতে জানিয়েছে যে আলোচনায় আশাব্যাঞ্জক অগ্রগতি হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে প্রযুক্তিগত আলোচনার একটি স্থায়ী কাঠামো তৈরি করা এবং হরমুজ প্রণালী দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর নিরাপদ যাতায়াত বজায় রাখার জন্য একটি সার্বক্ষণিক যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলা।
অবশ্য এই অগ্রগতির পথটা খুব একটা মসৃণ ছিল না। রবিবারের শুরুটা বেশ গোলমেলে ছিল। হিজবুল্লাহ যদি ইসরায়েলে হামলা জারি রাখে তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আবারও বিমান হানার হুমকি দেন, যার জেরে ইরান সাময়িকভাবে আলোচনা বন্ধ করে দিয়েছিল। যদিও পরে দু’পক্ষই পরিস্থিতি শান্ত রাখতে একটি বিশেষ চ্যানেল তৈরিতে রাজি হয়। এতদিন ধরে ইরানের ভূ-রাজনৈতিক সংকটের প্রতিটি ওঠানামার সাথে বিটকয়েন যেভাবে তাল মিলিয়ে চলেছে, সপ্তাহের শুরুতে তার এই স্থবিরতা বেশ অবাক করার মতোই। এখন দেখার বিষয়, আগামী ৬০ দিনের রোডম্যাপ কতটা কার্যকর হয় এবং ক্রিপ্টো বাজার আবার চাঙ্গা ভাব বা ‘রিস্ক-অন’ মেজাজে ফেরে নাকি জুনের শুরুর স্তরের নিচেই আটকে থাকে।
শেয়ারের ডিভিডেন্ড এবার সরাসরি বিটকয়েনে: প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগের নতুন চাল
স্পট মার্কেটে ট্রেডাররা যখন কিছুটা দিশাহীন হয়ে নির্দিষ্ট রেঞ্জের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছেন, ঠিক তখনই প্রাতিষ্ঠানিক লগ্নিকারীদের জন্য এক অভিনব দীর্ঘমেয়াদি পথ তৈরি করছে ঐতিহ্যবাহী আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো। বিটকয়েনের এই সাময়িক স্থবিরতার মাঝেই মার্কিন সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (SEC)-এর কাছে জমা দেওয়া নথিতে ওয়াল স্ট্রিটের এক শীর্ষস্থানীয় অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি তাদের আগের রেজিস্ট্রেশন কাঠামো সংশোধন করে দুটি নতুন এক্সচেঞ্জ-ট্রেডেড ফান্ড (ETF)-এর প্রস্তাব এনেছে। এই ফান্ডগুলোর বিশেষত্ব হলো, এরা মার্কিন শেয়ার বাজারের এক্সপোজারের সাথে লভ্যাংশ বা ডিভিডেন্ড পুনর্বিনিয়োগের (DRIP) মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিটকয়েন কেনার একটি নির্দিষ্ট পদ্ধতিকে জুড়ে দিচ্ছে।
১৮ জুনের এই ফাইলিংয়ে দুটি বিশেষ ইটিএফ-এর ব্লুপ্রিন্ট সামনে আনা হয়েছে—একটি লার্জ-ক্যাপ ইক্যুইটির জন্য এবং অপরটি ইনোভেশন বা উদ্ভাবনী খাতের জন্য। ফিন্যান্সিয়াল ডেটা ও ইনডেক্স প্রদানকারী একটি বিখ্যাত সংস্থার তৈরি করা সূচকের ওপর ভিত্তি করে এই দুটি প্রোডাক্ট কাজ করবে। শুরুর দিকে এই সূচকগুলোর পোর্টফোলিওতে ৯৫% থাকবে সাধারণ ইক্যুইটি বা শেয়ার এবং বাকি ৫% বরাদ্দ থাকবে বিটকয়েনের জন্য। তবে আসল খেলাটা লুকিয়ে আছে ডিভিডেন্ডে; ইনডেক্সের নিয়ম অনুযায়ী, শেয়ার থেকে পাওয়া লভ্যাংশের টাকা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিটকয়েন-সংশ্লিষ্ট বিনিয়োগে চলে যাবে।
এই প্রস্তাবিত ফান্ড দুটির প্রথমটি নজর রাখবে ‘মার্কিন লার্জ-ক্যাপ ৫০০ বিটকয়েন ড্রিপ ইনডেক্স’-এর ওপর, যা মূলত বাজার মূলধনের নিরিখে আমেরিকার সবচেয়ে বড় ৫০০টি কোম্পানির ওপর ভিত্তি করে তৈরি। ফ্লোট-অ্যাডজাস্টেড পদ্ধতিতে শেয়ারগুলোর ওয়েটেজ ঠিক করা হবে এবং কোনো একক কোম্পানির শেয়ার যাতে পোর্টফোলিওতে অতিরিক্ত আধিপত্য বিস্তার না করতে পারে, তার জন্য নির্দিষ্ট সীমা থাকবে। ২০২৬ সালের ৩০ এপ্রিলের হিসাব অনুযায়ী, এই সূচকে ৪৯৮টি সিকিউরিটিজ অন্তর্ভুক্ত ছিল।
অন্যদিকে, উদ্ভাবনী প্রযুক্তির দিকে ঝুঁকতে থাকা বিনিয়োগকারীদের জন্য আসছে ‘ইউএস ইনোভেশন বিটকয়েন ড্রিপ ইনডেক্স ইটিএফ’। এটি অনুসরণ করবে ‘ইউএস ইনোভেশন ১০০ বিটকয়েন ড্রিপ ইনডেক্স’-কে। নাসডাক-এ তালিকাভুক্ত ১০০টি বড় মার্কিন কোম্পানিকে নিয়ে এই বেঞ্চমার্ক তৈরি করা হচ্ছে, তবে এর থেকে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বা ফিন্যান্স কোম্পানিগুলোকে বাদ রাখা হয়েছে। এছাড়া লিকুইডিটি, ট্রেডিং ভলিউম এবং পাবলিক ফ্লোটের মতো কড়া ফিল্টার পার করেই কোম্পানিগুলো এই সূচকে জায়গা পায়।
সরাসরি বা পরোক্ষভাবে ক্রিপ্টো মার্কেটে পা রাখতে এই ফান্ডগুলো কোনো একটি নির্দিষ্ট পথ ধরছে না। ক্রিপ্টো-লিঙ্কড এক্সচেঞ্জ-ট্রেডেড ভেহিকল, ফিউচারস, অপশনস এবং বিটকয়েনের দামের সাথে যুক্ত অন্যান্য সিকিউরিটিজের সংমিশ্রণে এই বিনিয়োগ চালানো হবে। এমনকি প্রয়োজনে ডিজিটাল অ্যাসেটের এক্সপোজার ধরে রাখতে কেম্যান আইল্যান্ডসের সম্পূর্ণ মালিকানাধীন একটি সহায়ক সংস্থাকে (subsidiary) ব্যবহার করার অনুমতিও রাখা হয়েছে এই রেজিস্ট্রেশন নথিতে। প্রসপেক্টাস অনুযায়ী, ফান্ড দুটি সম্পূর্ণ প্যাসিভ বা নিষ্ক্রিয় কৌশলে চলবে। হয় তারা ইনডেক্সের সমস্ত সিকিউরিটিজ নিজেদের কাছে রাখবে, নয়তো এমন একটি স্যাম্পলিং পদ্ধতি ব্যবহার করবে যা ইনডেক্সের পারফরম্যান্সকে নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তুলতে পারে। বিশ্ববাজারের এই দোলাচলের মাঝে ট্র্যাডিশনাল ফিন্যান্স আর ক্রিপ্টোর এই সুপরিকল্পিত মেলবন্ধন দীর্ঘমেয়াদে বাজারের মোড় কোন দিকে ঘোরায়, একজন বিশেষজ্ঞ হিসেবে সেদিকেই আমার মূল নজর থাকবে।
More Stories
বিটকয়েনের দাম ৬৩,০০০ ডলারের গুরুত্বপূর্ণ সাপোর্টের নিচে — কেন এটি আরও কমতে পারে এবং এর মূল বিষয়গুলো
মার্কিন-ইরান শান্তি চুক্তির আবহে সোনার দামে বড়সড় লাফ: একনজরে আজকের বাজারদর
বিশ্বঅর্থনীতির মন্দার মেঘ, তাও বৃদ্ধির দৌড়ে প্রথম সারিতেই ভারত; তবে চড়ছে রাজকোষ ঘাটতির পারদ