সাধারণত যুদ্ধের ছবিতে আমরা রক্তারক্তি, বারুদের গন্ধ আর গোলাগুলির উন্মাদনা দেখতেই অভ্যস্ত। কিন্তু লুকাস ডোন্ট-এর তৃতীয় ছবি ‘কাওয়ার্ড’ (Coward) যেন এক বিরল রত্ন, যা যুদ্ধের ওই বীভৎসতার মাঝেও অদ্ভুত এক মায়া আর কোমলতার খোঁজ দেয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে বেলজিয়ান ফ্রন্টলাইনের প্রেক্ষাপটে তৈরি এই ছবিটি আসলে দুই সৈনিকের একটা জমাট প্রেমের গল্প। রণক্ষেত্রের বাইরে যে সম্পর্কের অস্তিত্ব হয়তো তারা নিজেরাই কল্পনা করতে ভয় পেত, সেটাই এখানে ফুটে উঠেছে। ডোন্টের আগের ছবিগুলোর (যেমন ‘গার্ল’ বা কান-এ গ্রাঁ প্রিঁ জেতা ‘ক্লোজ’) তুলনায় এই ছবিতে আবেগ নিয়ে কোনো আদিখ্যেতা নেই, বরং একটা পরিণত সংযম আছে যা ছবিটাকে আরও বেশি ছুঁয়ে যাওয়ার মতো করে তুলেছে। কান চলচ্চিত্র উৎসবে আবার ফিরে এসে ডোন্ট একটা দারুণ চমক দিয়েছেন—যুদ্ধের ময়দানে সেই সময়ের প্রায় অজানা ‘ড্র্যাগ থিয়েটার’ বা পুরুষদের নারীবেশে অভিনয়ের বিষয়টাকে তিনি এই সমকামী প্রেমের ক্যানভাস হিসেবে ব্যবহার করেছেন। তবে এসব ছাপিয়েও ইমানুয়েল ম্যাকিয়া এবং ভ্যালেন্টিন ক্যাম্পেইনের অনবদ্য কেমিস্ট্রিই ছবিটার আসল ইউএসপি।
সহযোদ্ধাদের কাছে পিয়ের (ম্যাকিয়া)-র ডাকনাম ‘কোয়াইট মাউস’। মুখচোরা, শান্তশিষ্ট এই ছেলেটি কিন্তু নিজের কাজে বেশ পটু, সে গোলাবারুদ বওয়াই হোক বা মৃতদেহ সরানো। তার চোখ আটকে যায় ফ্রান্সিসের (ক্যাম্পেইন) ওপর। রেজিমেন্টের অ্যামেচার থিয়েটার ট্রুপের রীতিমতো স্টার এই ফ্রান্সিস, যেখানে পুরুষরাই নারী ও পুরুষ—উভয় চরিত্রেই অভিনয় করে। স্টেজে ফ্রান্সিসের সেই অনায়াস ‘ক্যাম্প’ মেজাজ থাকা সত্ত্বেও, সে বাকি সবার ভারী আদরের। মজার ব্যাপার হলো, সে যে সমকামী, এটা যেন বাকিরাও একপ্রকার জানে বা অন্তত আন্দাজ করে। পিয়ের আর ফ্রান্সিসের মধ্যে খুব দ্রুত একটা তীব্র আকর্ষণ তৈরি হয়, আর নাটকের মহড়ার ফাঁকেই শুরু হয় তাদের লুকিয়ে প্রেম।
‘ক্লোজ’ ছবির মতোই, এখানেও ডোন্ট দুজন পুরুষের ভেতরের সমীকরণটাকে খুব কাছ থেকে ধরেছেন, তবে প্রেক্ষাপটটা এবার অনেক বড়। ছবিতে বেশ কিছু যুদ্ধের দৃশ্য থাকলেও, সিনেমাটোগ্রাফার ফ্র্যাঙ্ক ভ্যান ডেন ইডেন সেগুলোর বিশালত্বকে খুব বুদ্ধি করে কমিয়ে এনেছেন। ফলে দৃশ্যগুলো রোমহর্ষক হওয়ার বদলে অনেক বেশি বাস্তব আর পরিবেশের সঙ্গে মানানসই হয়ে ওঠে। ক্লেয়ার ডেনিসের ‘ব্যু ট্রাভেইল’-এর মতো এখানেও চলমান তরুণ শরীরের সৌন্দর্যকে লেন্সবন্দি করা হয়েছে, যেখানে পুরুষতন্ত্রের চিরাচরিত কাঠিন্য বা আগ্রাসনের বদলে একটা অদ্ভুত পেলবতা আর ইতস্তত ভাব চোখে পড়ে।
থিয়েটারের দৃশ্যগুলোতেও পুরুষদের এই পারস্পরিক বন্ধনের বিষয়টা দারুণ সহানুভূতির সঙ্গে উঠে আসে। স্টেজে ফ্রান্সিস যখন মেয়েদের চরিত্রে চুটিয়ে অভিনয় করছে, তখন তাকে নিয়ে কেউ মশকরা করে না। উল্টে, তাদের এই জেন্ডার-বেন্ডিং পারফরম্যান্স দেখে দর্শকরা রীতিমতো হাততালি দেয়। সেই যুগের প্রেক্ষাপটে এই ধরনের বিষয় কতটা সমালোচিত হতে পারত, সেই ধারণাকে এই দৃশ্যগুলো একেবারে ভেঙে দেয়। এমনকী এই শো এতটাই হিট যে, অফিসাররা ফ্রান্সিসের দলকে ফ্রন্টলাইনে ট্যুর করার নির্দেশ দেয় সৈন্যদের মনোবল বাড়ানোর জন্য। কিন্তু বেলজিয়ান সেনবাহিনীর এই তথাকথিত ‘উদারতা’-র আড়ালেই লুকিয়ে আছে এক চরম পরিহাস: পিয়ের আর ফ্রান্সিসকে নিজেদের সম্পর্কটা সযত্নে লুকিয়ে রাখতে হয়, নইলে চরম শাস্তির খাঁড়া নেমে আসবে।
গল্পের গতিপথ চেনা ছকেই এগোয়, কিন্তু দুই মূল অভিনেতার সারল্য আর দুর্বলতা চিত্রনাট্যের সেই সম্ভাব্য একঘেয়েমিকে কাটিয়ে দেয়। লাজুক কৃষকের ছেলে পিয়ের আর শহুরে দর্জি ফ্রান্সিসের এই বৈপরীত্য তাদের রসায়নে একটা আলাদা বারুদ যোগ করেছে। ছবির শুরুর দিকে একজন সৈনিক আক্ষেপ করেছিল যে এই যুদ্ধ হয়তো কোনোদিনই শেষ হবে না। কিন্তু ছবির শেষে ফ্রান্সিসের ভয়টা একদম উল্টো—তার ভয়, যুদ্ধ একদিন সত্যি শেষ হবে, আর তাকে বাধ্য হয়ে ফিরে যেতে হবে সেই দমবন্ধ করা ‘স্বাভাবিক’ জীবনে। দেশের জন্য লড়তে এসে মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়েও, এই রণক্ষেত্রটাই তাদের একমাত্র জায়গা যেখানে তারা অন্তত নিজেদের মতো বাঁচতে পারছে।
সিনেমার পর্দায় এই ধরনের সংবেদনশীল এবং মনস্তাত্ত্বিক বিষয় নিয়ে ডিল করাটা একটা আর্ট। এখানে একটু এদিক-ওদিক হলেই পুরো বিষয়টা ঘেঁটে যেতে পারে। আর ঠিক কীভাবে একটা আপাত-গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে চূড়ান্ত বোরিং আর স্থূল করে তোলা যায়, তার জলজ্যান্ত প্রমাণ হলো নেটফ্লিক্সের নতুন কমেডি ‘লেডিজ ফার্স্ট’ (Ladies First)। নস্টালজিয়ার নামে সবকিছু গেলানোর এই আপ্রাণ চেষ্টায় নেটফ্লিক্স এবার ২০০০-এর দশকের শুরুর দিকের সেই জঘন্য ব্রিটিশ কমেডিগুলোর ভূত নামানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
অ্যালগরিদম বোধহয় ভেবেছে সেই অভিশপ্ত যুগটাকে আবার ফিরিয়ে আনা দরকার। আর সেই ভাবনা থেকেই জন্ম নিয়েছে ‘লেডিজ ফার্স্ট’-এর মতো একটা সস্তা আর জোর-করে-হাসানো ছবি, যা সেই আমলেও ব্যাকডেটেড লাগত। এটা আসলে একটা জঘন্য থট-এক্সপেরিমেন্ট—কী হতো যদি নারী-পুরুষের সামাজিক অবস্থানটা উল্টে যেত? এই কনসেপ্ট নিয়ে ছবিটা নিজের পিঠ নিজেই এমনভাবে চাপড়ায় যে একে কোনোভাবেই একটা কিউট থ্রোব্যাক বলা যায় না। সবচেয়ে বড় আফসোস হয় কাস্টিং দেখে। ডেভিড ফিঞ্চারের ‘গন গার্ল’-এ রোজামুন্ড পাইক যে লেভেলের অভিনয় করেছিলেন, তারপর এই ছবিতে তাকে দেখাটা রীতিমতো অপরাধ। পাইক তবুও নিজের চরিত্রে মানানসই, কিন্তু সাচা ব্যারন কোহেনের কাস্টিং একেবারে যাচ্ছেতাই। ড্যামিয়েন স্যাক্স নামের এক অহংকারী, সেক্সিস্ট পুরুষের চরিত্রে তাকে বড্ড আড়ষ্ট লাগে। ‘হোয়াট উইমেন ওয়ান্ট’ ছবিতে মেল গিবসনের যে একটা সহজাত ক্যারিশমা ছিল, সাচার মধ্যে তার ছিটেফোঁটাও নেই। তার এই বিভ্রান্তিকর অভিনয় একটা খারাপ ছবিকে আরও খাদের দিকে ঠেলে দেয়।
গল্পে দেখা যায়, মাথায় চোট পেয়ে ড্যামিয়েন এমন এক দুনিয়ায় জাগে যেখানে মেয়েরা সবকিছুর কর্ত্রী আর পুরুষরা সেখানে টিঁকে থাকার জন্য লড়াই করছে। পল এখানে পলিন, হ্যারি পটার হয়ে গেছে হ্যারিয়েট, ফাইভ গাইজ নাম বদলে ফাইভ গ্যালস। যে অ্যাড এজেন্সিতে ড্যামিয়েন একসময় রাজা ছিল, সেখানেই এখন সে রোজ সেক্সুয়াল হ্যারাসমেন্টের শিকার হওয়া এক চুনোপুঁটি। অন্যদিকে পাইকের চরিত্রটি এখন কর্পোরেট দুনিয়ার শীর্ষে। রিচার্ড ই গ্র্যান্টের মতো অভিনেতাকে দিয়ে একটা ম্যাজিকাল ভবঘুরের চরিত্র করানো হয়েছে, যার সাহায্যে সিস্টেমের বিরুদ্ধে ড্যামিয়েনকে লড়াই করতে হবে।
‘আই ফিল প্রিটি’ বা ‘ইজন্ট ইট রোমান্টিক’-এর মতো ছবির ক্যাটেগরিতে এটিকে ফেলার চেষ্টা হলেও, চিত্রনাট্যের দৈন্যদশা পদে পদে স্পষ্ট। পিচ মিটিংয়ে হয়তো আইডিয়াটা শুনতে দারুণ লেগেছিল, কিন্তু পর্দায় সেটাকে টেনেটুনে লম্বা করতে গিয়ে পুরো বিষয়টা তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়েছে। ৮৪ মিনিটের এই ছোট ছবিটাও যেন শেষ হতে চায় না। কর্মক্ষেত্রে মেয়েরা যে আজও বৈষম্যের শিকার, এই অমোঘ সত্যিটাকে এরা এমন কার্টুনের মতো করে দেখিয়েছে যে পুরো বিষয়টা একটা বিরাট সময়ের অপচয় মনে হয়। চিত্রনাট্যকাররা যেন প্রতিটা জোর-করা জোকসের পর দর্শকদের দিকে তাকিয়ে আছেন এটা বোঝার জন্য যে আমরা হাসছি কি না! “মাদারফাকার”-এর বদলে “ফাদারফাকার” বলা বা “ড্রামা কুইন”-এর জায়গায় “ড্রামা কিং” বসিয়ে দিলেই যে সেটা দুর্দান্ত কমেডি হয়ে যায় না, এই সাধারণ সত্যিটাই ‘লেডিজ ফার্স্ট’-এর নির্মাতারা বুঝতে ব্যর্থ হয়েছেন। সমাজকে জ্ঞান দেওয়ার চক্করে ছবিটা বিনোদন দিতেই ভুলে গেছে।
More Stories
রাম চরণের ‘পেদ্দি’ ও হইচইয়ের ‘গোলাম মামুন ২’: নেপথ্যের অনিশ্চয়তা আর নতুন জল্পনা
বিনোদন দুনিয়ার হালচাল: ‘ধুরন্ধর ২’-এ এমরান হাশমির চমক এবং নতুন বিজ্ঞাপনে রাজ-তিথী জুটি
গুগলের দ্বিমুখী কৌশল: একদিকে এআই দিয়ে সাহিত্যচর্চা, অন্যদিকে বিজ্ঞাপনের দাপট