টেক্সাসের ডালাস কাউবয়স স্টেডিয়ামে তখন প্রায় ৭০ হাজার দর্শকের গ্যালারি সরগরম। উত্তর আমেরিকায় বিশ্বকাপের আসর শুরু হতেই গ্রুপ এফ-এর প্রথম ম্যাচে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই দেখল ফুটবল বিশ্ব। নেদারল্যান্ডসের মতো শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে দু’বার পিছিয়ে পড়েও দুর্দান্ত কামব্যাক করল এশিয়ার অন্যতম সফল দল জাপান। ২-২ গোলের এই ড্র যেন বুঝিয়ে দিল, টুর্নামেন্টে ‘ডার্ক হর্স’ হিসেবে এই দুই দলেরই নাম কেন উঠে আসছে। চোট-আঘাতের কারণে দুই শিবিরেরই বেশ কয়েকজন প্রথম সারির তারকা এই টুর্নামেন্টে নেই, কিন্তু মাঠে তার কোনো প্রভাবই চোখে পড়েনি।
প্রথমার্ধে লড়াইটা মূলত মাঝমাঠেই সীমাবদ্ধ ছিল। ডাচরা শুরু থেকেই বেশ আত্মবিশ্বাসী ফুটবল খেলছিল। ম্যাচের তিন মিনিটের মাথায় ডনিয়েল মালেনের একটা শট দারুণ দক্ষতায় বাঁচিয়ে দেন জাপানের গোলরক্ষক জায়ন সুজুকি। ওই বিশাল শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত এরিনায় জলপানের বিরতির সময় জায়ান্ট স্ক্রিনে স্থানীয় এনএফএল দলের চিয়ারলিডারদের পারফরম্যান্সও বেশ উপভোগ করেছেন দর্শকরা। খেলা আবার শুরু হতেই রোমার ফরোয়ার্ড মালেন একটা কর্নার থেকে হেড করে ফের সুজুকির পরীক্ষা নেন, অন্যদিকে কোডি গাকপোর শট বারের ওপর দিয়ে বেরিয়ে যায়। বিরতির ঠিক আগে অবশ্য জাপানের কেইতো নাকামুরাও একটা সহজ সুযোগ নষ্ট করেন।
আসল খেলাটা জমল দ্বিতীয়ার্ধে। ডাচদের আকাশপথে আক্রমণগুলো শুরু থেকেই বেশ বিপজ্জনক দেখাচ্ছিল। ৫১ মিনিটের মাথায় রায়ান গ্র্যাভেনবার্চের নিখুঁত ক্রসে মাথা ছুঁইয়ে নেদারল্যান্ডসকে এগিয়ে দেন লিভারপুল তারকা ভার্জিল ফন ডাইক। কিন্তু সেই লিডের আয়ু ছিল মাত্র ছ’মিনিট। জান পল ফন হেক-এর গায়ে লেগে সামান্য দিক পরিবর্তন করা বলকে জালে জড়িয়ে সমতা ফেরান নাকামুরা। এরপরের কয়েকটা মিনিট মাঠে রীতিমতো পাগলাটে ফুটবল চলল। ৬৪ মিনিটে ওয়েস্ট হ্যামের উইঙ্গার ক্রাইসেনসিও সামারভিলের বাঁ-পায়ের দুর্দান্ত বাঁকানো শটে ডাচরা ফের লিড নেয়। মনে হচ্ছিল ডাচরাই হয়তো ম্যাচটা বের করে নেবে। কিন্তু শেষ মুহূর্তে, ৮৮ মিনিটে ক্রিস্টাল প্যালেসের মিডফিল্ডার দাইচি কামাদার শট ডিফ্লেক্ট হয়ে জালে জড়ালে এক পয়েন্ট নিশ্চিত করে মাঠ ছাড়ে হাজিমে মোরিয়াসুর দল। উল্লেখ্য, রবিবার রাতেই এই গ্রুপ এফ-এর অপর এক আকর্ষণীয় ম্যাচে তিউনিশিয়ার মুখোমুখি হওয়ার কথা সুইডেনের।
টেক্সাস যখন এই রুদ্ধশ্বাস লড়াইয়ের সাক্ষী, তখন নাসার শহর হিউস্টন দেখল এক অন্যরকম উত্থান। চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন জার্মানির শুরুটা মোটেও মসৃণ ছিল না। খেলার ২১ মিনিটের মাথায় জার্মান ডিফেন্সের চূড়ান্ত গাফিলতির সুযোগ নিয়ে কুরাসাওয়ের হয়ে বিশ্বকাপের ইতিহাসে তাদের প্রথম গোলটি করে বসেন ২২ বছর বয়সী লিভানো কোমেনেঞ্চিয়া। গোলটা শেষমেশ দলের কোনো কাজে না এলেও, গ্যালারিতে উপস্থিত হাজার হাজার কুরাসাও সমর্থকের জন্য ওই মুহূর্তটা ছিল বাঁধভাঙা আনন্দের।
কিন্তু ওই আনন্দটুকুই সার। এরপর যেন ঘুম ভাঙল জার্মান মেশিনের। একনাগাড়ে ছ’খানা গোল হজম করতে হল কুরাসাওকে, ফলাফল সেই ৭-১! এই বিশাল জয়ে আলাদা করে নজর কাড়লেন বেশ কয়েকজন তরুণ তুর্কি।
লেফট-ব্যাক পজিশন নিয়ে জার্মান দলে একটা লম্বা সময় ধরে দোলাচল ছিল। ডেভিড রাউম বা ম্যাক্সিমিলিয়ান মিতেলস্ট্যাড—কেউই সেভাবে জায়গা পাকা করতে পারছিলেন না। মিতেলস্ট্যাড তো দলেই সুযোগ পাননি, আর রাউম বেঞ্চ গরম করছেন একটাই কারণে—নাথানিয়েল ব্রাউন। এই ২২ বছর বয়সী তরুণ নিজের অভিষেক ম্যাচেই একটা গোল আর একটা অ্যাসিস্ট করে প্রমাণ করে দিলেন, কেন তাকে জার্মানির অন্যতম সেরা প্রতিভা বলা হচ্ছে।
অন্যদিকে, চোট সারিয়ে ফেরা জামাল মুসিয়ালাকে প্রথম একাদশে রাখা নিয়ে কম জলঘোলা হয়নি। লোথার ম্যাথাউস বা থমাস মুলারের মতো কিংবদন্তিদের কথায় সায় দিয়ে কোচ জুলিয়ান নাগলসম্যান তাকে সুযোগ দিয়েছিলেন। আর ৪৭ মিনিটের মাথায় মুসিয়ালার গোলটাই যেন তার হারানো আত্মবিশ্বাস ফেরানোর জন্য যথেষ্ট ছিল। মাঠে তার ক্ষিপ্রতা আর বল কন্ট্রোল বারবার বিপদে ফেলেছে বিপক্ষকে। জার্মানি যদি এবার বিশ্বকাপের স্বপ্ন দেখে, তবে মুসিয়ালাকে ঠিক এই ফর্মেই দরকার।
সবশেষে বলতেই হয় ডেনিজ উন্দাভের কথা। ৬৪ মিনিটে বদলি হিসেবে নেমে একটা গোল করা আর দুটো করানো—একেবারে নিখুঁত ‘ইমপ্যাক্ট সাব’-এর উদাহরণ। বিশ্বকাপের আগে নাগলসম্যান তাকে খোঁচা দিয়ে বলেছিলেন যে সে নাকি শুধু ক্লান্ত ডিফেন্সের বিপক্ষেই গোল করতে পারে। মজার ব্যাপার হল, কোচের সেই কথা ভুল প্রমাণ করতে গিয়ে উন্দাভ আসলে নাগলসম্যানের সেই ‘সুপার-সাব’ তত্ত্বকেই মান্যতা দিয়ে বসলেন। ভেবে দেখলে মনে হয় নাগলসম্যান সত্যিই একজন জিনিয়াস, আর উন্দাভও বুঝিয়ে দিলেন জার্মানির আক্রমণভাগে তিনি ঠিক কতটা কার্যকরী একটা অস্ত্র।
More Stories
কুইন্স ক্লাবের সবুজ ঘাসে আলো-আঁধারি: সেরেনার অসমাপ্ত প্রত্যাবর্তনের মাঝেই আমান্ডার দাপট, আর হোলগারের দীর্ঘশ্বাস
ভারতের অলিম্পিক স্বপ্নের সামনে ডোপিংয়ের ছায়া, তবু ২০৩৬-এর লড়াইয়ে পিছিয়ে যেতে নারাজ নয়াদিল্লি
বিশ্বকাপের আগে দুই মেরুর সংকট: অনিশ্চয়তায় লিটন দাস, ভারতের প্রস্তুতিতেও বড় ফাঁক