কয়েক বছর আগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর শুরুর দিনগুলোয় ইন্টারনেটে একটা মিম খুব জনপ্রিয় হয়েছিল। সেখানে এআই বিপ্লবকে তুলনা করা হয়েছিল ১৯ শতকের ক্যালিফোর্নিয়ার ‘গোল্ড রাশ’ বা সোনার খনি খোঁজার উন্মাদনার সঙ্গে। বলা হয়েছিল, এই পুরো হুজুগে এনভিডিয়ার ভূমিকা ঠিক সেই চতুর ব্যবসায়ীদের মতো, যারা সোনা খোদাইকারীদের কাছে বেলচা বিক্রি করে রাতারাতি বড়লোক হয়েছিল। গুগল বা মাইক্রোসফটের মতো টেক জায়ান্টরা যখন নিজেদের বড় বড় এআই মডেল আর ডেটা সেন্টার তৈরিতে ব্যস্ত, তখন এনভিডিয়া তাদের সেই গ্রাফিক্স চিপ বা জিপিইউ জোগান দিয়ে গেছে, যা ছাড়া এই পুরো প্রযুক্তিগত বিপ্লব অসম্ভব ছিল।
কিন্তু যারা বেলচা তৈরি করে, তাদের নিজেদেরও তো কাঁচামাল আর যন্ত্রাংশের জন্য অন্যের ওপর নির্ভর করতে হয়। এনভিডিয়ার ক্ষেত্রে সেই সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য এবং গুরুত্বপূর্ণ জোগানদারটি হলো এসকে হাইনিক্স। উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন মেমরি চিপের আকাশছোঁয়া চাহিদার ওপর ভর করে এই দক্ষিণ কোরীয় চিপ প্রস্তুতকারক সংস্থাটি আজ এআই জোয়ারের অন্যতম বড় সুবিধাভোগী। মে মাসেই কোম্পানিটি ১ ট্রিলিয়ন ডলারের বাজার মূল্য (মার্কেট ক্যাপিটালাইজেশন) অতিক্রম করে এক নতুন ইতিহাস গড়েছে। স্যামসাং ইলেকট্রনিক্স এবং টিএসএমসি-র পর এশিয়ায় এই মাইলফলক ছোঁয়া তৃতীয় কোম্পানি হলো তারা। হাই-ব্যান্ডউইথ মেমরির (HBM) বাজারে নিজেদের একচ্ছত্র আধিপত্য বজায় রেখে এসকে হাইনিক্স আজ এআই সাপ্লাই চেইনের এমন এক স্তম্ভ হয়ে উঠেছে, যাকে ছাড়া এনভিডিয়ার মতো ট্রিলিয়ন ডলারের বিশ্বজয়ী জায়ান্টের চাকাও সচল রাখা অসম্ভব।
এআই ফ্যাক্টরির অন্দরমহল এবং ভার্টিভের প্রবেশ
তবে গল্পটা শুধু মেমরি চিপ বা প্রসেসরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এনভিডিয়ার তৈরি এই সুপার-চিপগুলো যখন হাজার হাজার সংখ্যায় একসঙ্গে কোনো ডেটা সেন্টারে কাজ করে, তখন সেগুলোকে আর সাধারণ সার্ভার রুম বলা যায় না; সেগুলো হয়ে ওঠে এক একটি ‘এআই ফ্যাক্টরি’। আর এই দানবীয় ফ্যাক্টরিগুলোকে সচল রাখতে প্রয়োজন হয় বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ এবং অত্যন্ত উন্নত মানের কুলিং বা ঠান্ডা করার পরিকাঠামো। এখানেই দৃশ্যপটে আগমন ঘটে ভার্টিভ হোল্ডিংসের।
এনভিডিয়ার সঙ্গে নিজেদের দীর্ঘদিনের অংশীদারিত্বকে আরও মজবুত করে ভার্টিভ এখন যৌথভাবে এমন কিছু ডেটা সেন্টার সলিউশন তৈরি করছে, যা সরাসরি এই এআই পরিকাঠামোর খোলনলচে বদলে দিতে পারে। এর মধ্যে অন্যতম হলো একটি ৮০০ ভোল্টের ডিসি পাওয়ার আর্কিটেকচার, যা সরাসরি এনভিডিয়ার হাই-ডেনসিটি প্ল্যাটফর্মের বিদ্যুৎ চাহিদাকে সামাল দেবে। পাশাপাশি, ভার্টিভ নিয়ে এসেছে একটি প্রোডাকশন-গ্রেড ‘ডিজিটাল টুইন’ প্রোডাক্ট। এনভিডিয়ার অমনিভার্স ডিএসএক্স-এর সঙ্গে যুক্ত এই সিস্টেমটি ডেটা সেন্টার অপারেটরদের প্রকৃত নির্মাণের আগেই পুরো বিদ্যুৎ ও কুলিং ব্যবস্থাকে একটি একক ডিজিটাল মডেল হিসেবে সিমুলেট করার সুযোগ দেয়। এর সুবিধা হলো, বাস্তব কাজ শুরুর পর শেষ মুহূর্তে নকশায় বড় কোনো বদল করতে হয় না এবং বাজেটও হিসেব মতো রাখা যায়।
বাজারের সমীকরণ ও বিনিয়োগকারীদের নজর
ওয়াল স্ট্রিট যখন স্পেসএক্স-এর সম্ভাব্য আইপিও-র অপেক্ষায় দিন গুনছে, তখন এই নতুন স্পেস রেস বা টেক রেসের সঙ্গে যুক্ত অনেক কোম্পানি কিন্তু ইতিমধ্যেই বাজারের কক্ষপথে নিজেদের শক্ত অবস্থান তৈরি করে নিয়েছে। ভার্টিভ তার একটি বড় উদাহরণ। ২৮০.৯৮ ডলারের শেয়ার মূল্য নিয়ে কোম্পানিটি গত তিন বছরে বিনিয়োগকারীদের দারুণ রিটার্ন দিয়েছে। চলতি বছরেই এর শেয়ারের দাম বেড়েছে প্রায় ৬০ শতাংশ এবং গত এক বছরের খতিয়ান দেখলে তা প্রায় ১৫৪.৪ শতাংশের কাছাকাছি। যদিও বাজারে সাম্প্রতিক কিছু কারেকশনের কারণে গত সপ্তাহে শেয়ারের দাম ১৫.২ শতাংশ এবং গত মাসে প্রায় ২৩.৬ শতাংশ কমেছে, তবুও যারা ডিজিটাল পরিকাঠামো এবং এআই থিমের ওপর দীর্ঘমেয়াদী বাজি ধরতে চান, তাদের কাছে এনভিডিয়ার সঙ্গে ভার্টিভের এই গভীর যোগসূত্র অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
বিনিয়োগকারীদের দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে, ভার্টিভ নিজেকে আর পাঁচটা সাধারণ হার্ডওয়্যার বিক্রেতার কাতার থেকে আলাদা করে ফেলেছে। কোনো প্রজেক্টে স্রেফ একবার যন্ত্রপাতি বিক্রি করেই তাদের দায়িত্ব শেষ হচ্ছে না। বরং শুরুর ডিজাইন থেকে শুরু করে ডেটা সেন্টারের কার্যকারিতা পরীক্ষা এবং নিয়মিত অপ্টিমাইজেশন—অর্থাৎ পুরো লাইফসাইকেলেই তারা এনভিডিয়ার একজন নির্ভরযোগ্য ইঞ্জিনিয়ারিং পার্টনার হিসেবে জায়গা করে নিচ্ছে। স্বাভাবিকভাবেই এটি কোম্পানির রেকারিং বা নিয়মিত সার্ভিসের আয়কে বাড়িয়ে তুলবে। তবে এই বাড়তি সুবিধার সাথে সাথে তাদের ওপর পারফরম্যান্সের চাপও বাড়ছে। স্নাইডার ইলেকট্রিক বা ইটনের মতো হেভিওয়েট প্রতিদ্বন্দীদের টেক্কা দেওয়া এবং এনভিডিয়ার অতি দ্রুত বদলে যাওয়া হার্ডওয়্যার সাইকেলের সঙ্গে পা মিলিয়ে নিজেদের সলিউশনকে আপগ্রেড করে যাওয়াটাই এখন ভার্টিভের সামনে আসল চ্যালেঞ্জ।
More Stories
অ্যাপলের জোড়া চমক: এআই মিউজিক ট্যাগিংয়ের পাশাপাশি এয়ারপডস ৪-এ বিশাল ছাড়