15 জুন 2026

হরমুজ প্রণালী পুনরায় খোলার জল্পনায় তেলের দামে বড় পতন: মার্কিন-ইরান শান্তি চুক্তির দিকেই তাকিয়ে বাজার

আন্তর্জাতিক তেলের বাজারে একটা বড়সড় স্বস্তির নিঃশ্বাস। বিশ্ববাজারের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় জ্বালানি সংকটের হয়তো এবার অবসান হতে চলেছে। আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে শান্তি চুক্তির সম্ভাবনায় অপরিশোধিত তেলের দাম একধাক্কায় অনেকটা কমে গেছে। এশিয়া-প্যাসিফিকের আর্থিক কেন্দ্রগুলোতে নতুন সপ্তাহের শুরুতেই ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেল প্রতি ৮৪ ডলারের নিচে নেমে এসেছে। মূলত হরমুজ প্রণালী খুব শিগগিরই আবার খুলে যেতে পারে এবং উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে ফের তেল রফতানি শুরু হবে—এমন আশাতেই বাজার এই ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে।

রবিবার ট্রাম্প তো একপ্রকার ঘোষণাই করে দিয়েছেন যে চুক্তি “এখন চূড়ান্ত”। যদিও সম্প্রতি বৈরুতে ইজরায়েলি বিমান হামলার জেরে এই স্পর্শকাতর আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার একটা বড় শঙ্কা তৈরি হয়েছিল। তবে চুক্তির অনেক খুঁটিনাটি এখনও ধোঁয়াশায় ঘেরা। বিশেষ করে কবে এই সামুদ্রিক রুট আবার পুরোদমে চালু হবে, নিরাপদ যাতায়াতের তদারকি কে করবে বা আদৌ কোনো শর্ত চাপানো হবে কি না, তা নিয়ে স্পষ্ট কোনো রূপরেখা নেই। অন্যদিকে, ইরানের তরফ থেকে জানানো হয়েছে, তেহরানের পরমাণু কর্মসূচি এবং নিষেধাজ্ঞার মতো বৃহত্তর ইস্যুগুলোর ফয়সালা করতে অন্তত ৬০ দিনের একটা আলোচনার সময়সীমা রাখা হবে।

সোমবারের শুরুতে আন্তর্জাতিক বেঞ্চমার্ক তেলের দাম ৪ শতাংশ কমেছে, যা শুক্রবারের পতনেরই একটা ধারাবাহিক রূপ। সত্যি বলতে, মার্চের শুরুতে ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে তেলের দাম এতটা নিচে আর নামেনি। গত সপ্তাহের বৃহস্পতিবার যেখানে তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ৯৩ ডলারে ঘোরাফেরা করছিল, ট্রাম্পের ওই শান্তি চুক্তির মন্তব্যের পর শুক্রবার তা ৮৭.৫০ ডলারে নেমে আসে। এর মধ্যেই খোদ মার্কিন প্রেসিডেন্ট দাবি করে বসেছেন যে, বিশ্ববাজারের চাপ কমাতে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে মার্কিন সেনা গোপনে প্রতিদিন লাখ লাখ ব্যারেল তেল এই প্রণালী দিয়ে পার করতে সাহায্য করছে। তথাকথিত “ডার্ক ট্যাংকারগুলো” লোকচক্ষুর আড়ালে ওমান উপসাগরে অপেক্ষমাণ জাহাজগুলোতে কার্গো পৌঁছে দিয়ে আবার লোড করার জন্য ফিরে যাচ্ছে।

মার্চের শুরুতে যুদ্ধের জেরে হরমুজ প্রণালী দিয়ে উপসাগরীয় তেলের রফতানি থমকে যাওয়ায় বাজার থেকে প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ব্যারেল তেল কার্যত উধাও হয়ে গিয়েছিল, যা বাজারের মোট জোগানের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ। পরিস্থিতি সামাল দিতে উপসাগরীয় উৎপাদকরা পাইপলাইনের মাধ্যমে বিকল্প আঞ্চলিক রফতানি হাবগুলোতে প্রতিদিন প্রায় ৫০ লাখ ব্যারেল তেল ঘুরিয়ে দিয়েছে। অন্যদিকে, ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সির (IEA) সদস্যরাও বাজার সামলাতে প্রতিদিন প্রায় ২৫ লাখ ব্যারেল করে জরুরি ক্রুড এবং জ্বালানি সরবরাহ করেছে। শুধু জোগান বাড়িয়েই নয়, চাহিদা কমার ফলেও এই ঘাটতি অনেকটা মেটানো গেছে। অনুমান করা হচ্ছে, চিন তাদের আমদানি প্রতিদিন প্রায় ৪০ লাখ ব্যারেল কমিয়ে দিয়েছে, যা গত এক দশকে সর্বনিম্ন। সম্ভবত তারা এখন আগ্রাসী মজুতদারি বন্ধ করে পুরনো স্টক থেকেই কাজ চালাচ্ছে। পাশাপাশি এশিয়ার পেট্রোকেমিক্যাল শোধনাগারগুলোও তাদের উৎপাদন কমানোয় বিশ্বজুড়ে তেলের চাহিদা প্রতিদিন ৩০ থেকে ৪০ লাখ ব্যারেল কমেছে।

এই ভূ-রাজনৈতিক টানাপোড়েন এবং হরমুজ প্রণালী পুনরায় খোলার সম্ভাবনা ভারতের জন্য আক্ষরিক অর্থেই একটা বড় লাইফলাইন। ভারত বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অপরিশোধিত তেল আমদানিকারক দেশ। ইরান এবং ওমানের মাঝের এই সরু জলপথ দিয়ে বিশ্বের মোট ব্যবহৃত তেলের প্রায় ২০ শতাংশ পারাপার হয়। সৌদি আরব, ইরাক, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি এবং কাতারের মতো ভারতের প্রধান জ্বালানি সরবরাহকারী দেশগুলোর রফতানির মূল রাস্তাই হলো এই হরমুজ প্রণালী। স্বাভাবিকভাবেই এই পথে জাহাজের যাতায়াত স্বাভাবিক হলে ভারতের তেলের জোগান নিয়ে দুশ্চিন্তা কমবে, পণ্য পরিবহণ খরচ কমবে এবং সর্বোপরি দেশের ভেতরের মূল্যবৃদ্ধির চাপ অনেকটাই প্রশমিত হবে।

তবে এই দাম কমার ট্রেন্ড যে অনন্তকাল চলবে, এমনটা ভাবার কোনো কারণ নেই। বাজার বিশ্লেষক সংস্থা আইজি (IG)-র টনি সিকামোর সোমবারই একটা বাস্তবসম্মত চিত্র তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে, রুট খুললেই বিভিন্ন দেশ তাদের ফুরিয়ে আসা মজুত ভাণ্ডার এবং স্ট্র্যাটেজিক রিজার্ভগুলো ফের ভরতে শুরু করবে। তাছাড়া, পরমাণু চুক্তির মতো জটিল বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা এত সহজে মেটার নয়। তাই খুব শিগগিরই যে তেলের দাম এখান থেকে আরও অনেকটা নিচে নেমে যাবে, এমনটা আশা করা একটু কঠিনই। বাজার আপাতত একটা অনিশ্চিত পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছে, যেখানে আগামী কয়েকটা দিনই ঠিক করে দেবে এই সাময়িক স্বস্তি দীর্ঘস্থায়ী হবে কি না।