मध्यপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি, জ্বালানির চড়া দাম আর বাজারের ক্রমবর্ধমান অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে বিশ্ব অর্থনীতিতে আবার মন্দার কালো মেঘ ঘনীভূত হচ্ছে। বিশ্ব ব্যাংক ২০২৬ সালের জন্য বিশ্বজনীন অর্থনৈতিক বৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়ে ২.৫ শতাংশ করেছে। পরিস্থিতি আরও বিগড়ে গেলে, বিশেষ করে জ্বালানি সরবরাহে বড়সড় টান পড়লে এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক বাজারে নতুন করে ধস নামলে এই বৃদ্ধির হার ১.৩ শতাংশ পর্যন্ত নেমে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ২০২৫ সালে যেখানে বৈশ্বিক বৃদ্ধির হার ছিল ২.৯ শতাংশ, সেখানে ২০২৬-এ তা কমে ২.৫ শতাংশে দাঁড়ানো মানে কোভিড অতিমারীর পর এটাই হবে সবচেয়ে দুর্বল আর্থিক পর্ব। তবে এই টালমাটাল আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির মধ্যেও ভারতের অর্থনীতি নিজের জায়গা অনেকটাই ধরে রাখতে পেরেছে। বিশ্ব ব্যাংকের সাম্প্রতিক ‘গ্লোবাল ইকোনমিক প্রসপেক্টস’ রিপোর্ট অনুযায়ী, ভারত বিশ্বের দ্রুততম বর্ধনশীল প্রধান অর্থনীতি হিসেবে নিজের তকমা বজায় রাখছে। ২০ Font২৬-২৭ অর্থবর্ষে ভারতের জিডিপি বৃদ্ধির হার ৬.৬ শতাংশ হতে পারে বলে মনে করছে তারা, যদিও এর আগের বছর এই হার ছিল প্রায় ৭ শতাংশ। তবে দীর্ঘমেয়াদে ২০২৭ ও ২০২৮ সালে এই বৃদ্ধির হার যথাক্রমে ৭.২ এবং ৭.০ শতাংশে পৌঁছাতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
ঘরোয়া বাজারের চাহিদা ও জ্বালানির আন্তর্জাতিক চাপ
চলতি বছরের শুরুর দিকে দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারের সামগ্রিক অর্থনৈতিক গতিবিধি বেশ চাঙ্গা ছিল। গ্রামীণ এলাকায় কেনাকাটা বা ভোগের পরিমাণ যেমন আশাব্যঞ্জক, তেমনই শহুরে চাহিদাও ধীরে ধীরে মন্দা কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে। এর স্পষ্ট প্রমাণ মিলেছে ঘরোয়া কেনাকাটা থেকে আদায় হওয়া জিএসটি (GST) বা অভ্যন্তরীণ বিক্রয় করের ধারাবাহিক বৃদ্ধিতে। তবে মুদ্রাস্ফীতি আর জ্বালানির লাগামছাড়া দাম সাধারণ মানুষের পকেটে টান ফেলছে, যা আগামী দিনে ব্যক্তিগত চাহিদাকে কিছুটা মন্থর করে দিতে পারে। এই পরিস্থিতিতে আমজনতাকে স্বস্তি দিতে এবং বাজারের কেনাকাটার ক্ষমতা ধরে রাখতে সরকার জ্বালানি তেলের ওপর শুল্ক কমানো বা জিএসটি-র হার পুনর্মূল্যায়নের মতো কিছু পদক্ষেপের কথা ভাবছে, যা বাজারের চাপ কিছুটা লাঘব করতে পারে। এছাড়া আন্তর্জাতিক বাজারে সামগ্রিক মন্দা থাকলেও আমেরিকার শুল্ক হ্রাস এবং বিভিন্ন দেশের সঙ্গে প্রস্তাবিত মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (FTA) ভারতের রপ্তানি বাণিজ্যকে কিছুটা অক্সিজেন জোগাতে পারে, যা বাইরের দুর্বল চাহিদার ক্ষতি পুষিয়ে দেবে।
তেলের ধাক্কা ও রাজকোষের টানাটানি
কিন্তু সবকিছুর পরেও তেল নিয়ে দুশ্চিন্তা দিল্লির পিছু ছাড়ছে না। ভারত তার প্রয়োজনের প্রায় ৯০ শতাংশ অপরিশোধিত তেলই বিদেশ থেকে আমদানি করে। ফলে ইরানকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যের অশান্তি এবং হরমুজ প্রণালী বন্ধ হওয়ার জেরে বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় সবচেয়ে বেশি কোপ পড়েছে ভারতের ওপরই। বিশ্ব বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম এ বছর গড়ে ব্যারেল প্রতি ৯৪ ডলারে পৌঁছাতে পারে, যা গত বছরের তুলনায় প্রায় ৩৬ শতাংশ বেশি। পরিস্থিতি যদি আরও জটিল হয় এবং তেলের দাম গড়ে ১১৫ ডলারে গিয়ে ঠেকে, তবে বিশ্ব অর্থনীতি আরও বড় ধাক্কা খাবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে মুদ্রাস্ফীতি ৪.৪ শতাংশে গিয়ে দাঁড়াতে পারে। ইতিমধ্যেই দেশের বাজারে রাষ্ট্রায়ত্ত তেল সংস্থাগুলি পেট্রোল ও ডিজেলের দাম প্রায় ৮ শতাংশ বাড়িয়েছে, পাশাপাশি রান্নার গ্যাসের সিলিন্ডারের ভর্তুকিও ছাঁটাই করা হয়েছে। অন্যদিকে চাষিদের জন্য সরকারের সারের ভর্তুকি খরচও এই অর্থবর্ষে প্রায় ২০ শতাংশ বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এই বিপুল ভর্তুকির চাপ সরাসরি এসে পড়ছে দেশের রাজকোষের ওপর। ব্লুমবার্গের একটি সাম্প্রতিক রিপোর্ট অনুযায়ী, ইরান যুদ্ধের জেরে জ্বালানি ও সারের চড়া ভর্তুকি সামাল দিতে গিয়ে ভারত সরকার এই বছর রাজকোষ ঘাটতি (Fiscal Deficit) জিডিপি-র ৪.৮ শতাংশ পর্যন্ত বাড়াতেও পিছপা হবে না। যদিও দেশের অর্থ মন্ত্রক এখনই এই নিয়ে চূড়ান্ত কিছু জানায়নি, তবে সরকারি কর্তারা বছরের শেষদিকের কর-বহির্ভূত রাজস্ব ও ভর্তুকির প্রকৃত খতিয়ান দেখেই এই আর্থিক ঘাটতির বিষয়টি পুনর্মূল্যায়ন করতে চান। ক্যাপিটাল এক্সপেন্ডিচার বা পুঁজিগত খরচের গতি কিছুটা কমিয়ে এবং অন্যান্য অপ্রয়োজনীয় খরচ ছেঁটে এই ঘাটতি সামাল দেওয়ার একটা চেষ্টা চলছে।
উন্নয়নশীল বিশ্বের ভবিষ্যৎ ও ‘হারানো দশক’-এর আশঙ্কা
বিশ্ব ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ ইন্দরমিত গিল স্পষ্টই জানিয়েছেন যে, ২০০৮ বা এমনকি ২০১৮ সালের তুলনায় আজকের বিশ্ব অর্থনীতি অনেক বেশি ভঙ্গুর এবং ধাক্কা সামলানোর ক্ষমতা এর বেশ কম। এই সংকটের আঁচ সবচেয়ে বেশি টের পাচ্ছে উন্নয়নশীল দেশগুলি, যাদের সামগ্রিক বৃদ্ধির হার ৪.৪ শতাংশ থেকে কমে ৩.৬ শতাংশে নেমে আসতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বহু উন্নয়নশীল দেশ এখন এক ‘হারানো দশক’-এর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে উন্নত দেশগুলির সঙ্গে আয়ের ফারাক কমার গতি প্রায় থমকে গেছে। চিনের মতো বড় অর্থনীতির বৃদ্ধির হারও ৫ শতাংশ থেকে কমে ৪.২ শতাংশে নামার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। সেখানে ইউরোজোন ০.৮ শতাংশ এবং জাপান মাত্র ০.৭ শতাংশ বৃদ্ধির মুখ দেখতে পারে। এই বৈশ্বিক সংকটের আবহে ভারতের ৬.৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস নিঃসন্দেহে কিছুটা স্বস্তিদায়ক, তবে আন্তর্জাতিক বাজারের তেলের আঁচ বাঁচিয়ে দেশের অভ্যন্তরীণ মুদ্রাস্ফীতি এবং রাজকোষের ঘাটতি নিয়ন্ত্রণে রাখাই হবে আগামী দিনে দিল্লির আসল পরীক্ষা।
More Stories
ইরান সংকট, মূল্যস্ফীতি এবং সোনা-রূপার বাজারে বিনিয়োগের চালচিত্র
এনভিডিয়ার আসল ‘পরিখা’ এবং ইন্টেলের সাথে এক নতুন সমীকরণ
অপরিশোধিত তেলের ঝাঁঝ আর ফেডের কড়া নজর: এশিয়ায় সোনার বাজারে মন্দার মাঝেই রিজার্ভ ব্যাংকের উলটপুরাণ