12 জুন 2026

রূপোলি পর্দায় নারী: ‘পেড্ডি’-র বিতর্কিত বক্স অফিস বনাম কঙ্গনার ‘ভারত ভাগ্য বিধাতা’-র লড়াই

সমালোচনার ঝড় উঠলেও বক্স অফিসে ‘পেড্ডি’-র জয়রথ থামার কোনো লক্ষণই নেই। অষ্টম দিনের শেষে ভারতে ছবিটির নেট কালেকশন ১৯৩.৫৫ কোটি টাকা। বিশ্বজুড়ে ব্যবসার অঙ্কটা ইতিমধ্যেই ২৭৯.৩৫ কোটি ছুঁয়েছে। ভারতের বুকে ২০০ কোটির মাইলফলক এখন স্রেফ সময়ের অপেক্ষা। স্যাকনিল্কের (Sacnilk) রিপোর্ট বলছে, অষ্টম দিনে ৭,৪১২টি শো থেকে ৬.৩০ কোটি টাকা পকেটে পুরেছে এই ছবি। আয়ের সিংহভাগই আসছে তেলুগু বলয় থেকে, শুধু বৃহস্পতিবারেই যোগ হয়েছে আরও ৫ কোটি টাকা।

বিদেশের মাটিতেও ব্যবসা মন্দ নয়, অষ্টম দিনে ০.৬০ কোটি নিয়ে ওভারসিজ কালেকশন দাঁড়িয়েছে ৪৯.৪০ কোটিতে। সব মিলিয়ে বিশ্বজুড়ে গ্রস কালেকশন সেই ২৭৯.৩৫ কোটি।

রাম চরণের ক্যারিয়ারে এই ছবিটা আক্ষরিক অর্থেই একটা বড়সড় স্বস্তি। ‘গেম চেঞ্জার’-এর বক্স অফিস ভরাডুবির পর নিজের দাপট প্রমাণ করার জন্য এমন একটা ব্লকবাস্টার ওপেনিং তাঁর ভীষণ দরকার ছিল। বিশ্বজুড়ে ১০০ কোটির ওপেনিং পাওয়া তেলুগু সিনেমার ইতিহাসে এটি ১১ নম্বর ছবি। এর আগে এস এস রাজামৌলির ‘আরআরআর’ (RRR) প্রথম দিনেই ২২৩ কোটি টাকার ব্যবসা করেছিল, যেখানে জুনিয়র এনটিআর-এর পাশাপাশি রাম চরণও ছিলেন।

বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে পেড্ডি

কিন্তু টাকার পাহাড় গড়লে কী হবে, ‘পেড্ডি’ নিয়ে বিতর্কের আঁচ নেহাত কম নয়। ছবিতে জাহ্নবী কাপুরকে যেভাবে অতিরঞ্জিত যৌন আবেদনময়ী (hyper-sexualised) রূপে দেখানো হয়েছে, তা নিয়ে রীতিমতো শোরগোল পড়ে গেছে। সমাজের বিভিন্ন স্তরের সেলিব্রিটিরা এই নিয়ে মুখ খুলেছেন। বিতর্কের জেরে পরিচালক বুচি বাবু সানা প্রকাশ্যে ক্ষমা চেয়েছেন এবং আশ্বাস দিয়েছেন যে ছবির কিছু দৃশ্য ছেঁটে ফেলা হবে।

তিনি এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, “প্রত্যেক নারীরই সম্মান প্রাপ্য। শক্তিশালী চরিত্র তুলে ধরার পাশাপাশি এই মূল্যবোধগুলো বজায় রাখতে আমরা বদ্ধপরিকর। যারা সততার সঙ্গে নিজেদের মতামত জানিয়েছেন, তাদের ধন্যবাদ।” রাম চরণ ও জাহ্নবী ছাড়াও এই ছবিতে আছেন বিজয় সেতুপতি, বোমান ইরানি, দিব্যেন্দু এবং জগপতি বাবু।

বাণিজ্যিক সিনেমায় যখন নারীদের স্রেফ গ্ল্যামার আর আবেদনের মোড়কে পরিবেশন করা নিয়ে এত তরজা, ঠিক তখনই বলিউড থেকে উঠে আসছে একদম অন্যরকম একটা ছবি। যেখানে নারীচরিত্ররা কোনো কাটবোর্ড কাটআউট নয়, বরং রক্তমাংসের লড়াকু যোদ্ধা। কথা বলছি কঙ্গনা রানাওয়াতের নতুন ছবি ‘ভারত ভাগ্য বিধাতা’ নিয়ে।

গ্ল্যামার নয়, লড়াইয়ের গল্প: ভারত ভাগ্য বিধাতা

গত কয়েকটা রিলিজ—থালাইভি, ধাকড়, তেজস, ইমার্জেন্সি—বক্স অফিসে মুখ থুবড়ে পড়ার পর কঙ্গনার ক্যারিয়ার গ্রাফ বেশ নিম্নমুখীই বলা চলে। ২০০৮ সালের ২৬ নভেম্বর মুম্বইয়ের কামা হাসপাতালে জঙ্গি হামলার প্রেক্ষাপটে তৈরি এই ফিমেল-সেন্ট্রিক সারভাইভাল থ্রিলার কি তাঁকে সেই কাঙ্ক্ষিত কামব্যাক এনে দিতে পারবে? ছবিটা দেখলে কিন্তু আশাবাদী হওয়াই যায়।

সবচেয়ে বড় চমক হলো কঙ্গনার পরিমিতিবোধ। মণিকর্ণিকা ফিল্মস-এর ব্যানারে তিনি নিজেই প্রযোজক, তা সত্ত্বেও চিত্রনাট্যে তিনি নিজেকে সবার উপরে বসিয়ে দেননি। স্টার-প্রযোজিত বলিউড ছবিতে সচরাচর যেটা হয়, এখানে তার উল্টোটাই ঘটেছে। কঙ্গনা ছবির কেন্দ্রে আছেন ঠিকই, কিন্তু তাঁর উপস্থিতির জেরে বাকি কাস্টরা ঢাকা পড়ে যাননি।

পরিচালক মনোজ তাপাড়িয়া ২৬/১১-র একটা অপেক্ষাকৃত কম পরিচিত অধ্যায়কে তুলে ধরেছেন। ছবিতে কঙ্গনা অভিনয় করেছেন নার্স গীতা গান্ধারের চরিত্রে। সেই অভিশপ্ত রাতে যখন কাসভ-সহ লস্কর-ই-তৈবার জঙ্গিরা হাসপাতালে তাণ্ডব চালাচ্ছে, তখন এই অখ্যাত নার্সরাই নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ২০ জন গর্ভবতী মহিলাকে বাঁচিয়েছিলেন। এর মধ্যে একজন তো আবার হাইপারটেনশনের রোগী, হামলার মাঝেই যাঁর লেবার পেইন শুরু হয়।

ছবির শুরুতেই দেখা যায় সায়াজী শিন্ডে (ক্যামিও)-র সঙ্গে গীতার কথোপকথন, যেখানে পুলিশ অফিসার তাঁকে ভয় ঝেড়ে ফেলে কাসভকে শনাক্ত করার জন্য সাহস জোগাচ্ছেন। এরপর ডাইনিং টেবিলের একটা দৃশ্যে গীতার স্বামী তাঁকে এই ঝামেলায় জড়াতে বারণ করেন, কারণ তাদের এক স্কুলপড়ুয়া মেয়ে আছে। এই যে একটা মানসিক দ্বন্দ্ব—কর্তব্য বনাম পরিবারের নিরাপত্তা—এটা বেশ বাস্তবসম্মত। তবে এটাই ছবির একমাত্র উপজীব্য নয়।

প্রোটোকল ভাঙার সাহস

দ্বিতীয়ার্ধে যখন আসল থ্রিলার শুরু হয়, তখন আমরা গিরিজা ওক, স্মিতা তাম্বে এবং রসিকা আগাশের মতো অভিনেত্রীদের দেখতে পাই। প্রত্যেকেই নার্সের ভূমিকায় দুর্দান্ত, ছবির গল্পে একটা আলাদা গভীরতা যোগ করেছেন তাঁরা।

মুম্বই হামলা নিয়ে এর আগে অনেক সিনেমা বা ওয়েব সিরিজ হলেও ‘ভারত ভাগ্য বিধাতা’ দেখতে বসে একবারও মনে হয় না যে আবার সেই চেনা গল্প দেখছি। এই ছবির সবচেয়ে শক্তিশালী দিক হলো এর অনাড়ম্বর টোন। কোনো সস্তা হাততালি কুড়ানোর চেষ্টা নেই। বরং ছবিতে খুব সুন্দরভাবে দেখানো হয়েছে যে কীভাবে বিপদের সময় প্রোটোকল আর নিয়মকানুনের তোয়াক্কা না করে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন স্বাস্থ্যকর্মীরা। হাসপাতালের সুপারিনটেনডেন্ট যখন প্রোটোকলের দোহাই দিয়ে মেমো ধরাচ্ছেন, তখন নার্সদের সেই প্রতিবাদী রূপটা বুঝিয়ে দেয় যে খাদের কিনারে দাঁড়িয়ে নিয়ম খাটে না।

হাসপাতালের ঘুপচি কোণে লুকিয়ে থাকার ভয়, বিল্ডিংয়ের ভেতর পাঞ্জাবি-ভাষী দুই রক্তলোলুপ জঙ্গির তাণ্ডব, আর তার মধ্যেই ক্রিটিকাল রোগীদের সেবা করে যাওয়া—সময় আর ভাগ্যের সঙ্গে এই অসম লড়াইটা পর্দায় রীতিমতো টানটান উত্তেজনা তৈরি করে। জঁরের খাতিরে কিছু চেনা ছক হয়তো আছে, তবে রোগীকে বাঁচানোর তাগিদে নার্সদের এই মরিয়া লড়াই ছবিটাকে অন্য মাত্রা দেয়। বাণিজ্যিক ছবির ভিড়ে এটি এমন একটি প্রচেষ্টা যা অন্তত নিজের সীমাবদ্ধতার মধ্যেই সবচেয়ে বেশি উজ্জ্বল।