বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশ ভারত একদিকে যখন ২০৩৬ সালের গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিক আয়োজনের লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক ক্রীড়া মহলে নিজেদের অবস্থান আরও শক্ত করতে ব্যস্ত, ঠিক তখনই ডোপিং-সংক্রান্ত পরিসংখ্যান সেই উচ্চাকাঙ্ক্ষার সামনে অস্বস্তিকর কিছু প্রশ্ন তুলে দিচ্ছে। বিশ্ব অ্যান্টি-ডোপিং সংস্থা (WADA)-র সর্বশেষ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০২৪ সালেও ডোপিংয়ে ধরা পড়া ক্রীড়াবিদদের সংখ্যার বিচারে ভারত বিশ্বের শীর্ষস্থানে রয়েছে। টানা তৃতীয় বছরের মতো এই তালিকার প্রথম স্থানে থাকা দেশটির জন্য বিষয়টি নিঃসন্দেহে বিব্রতকর, বিশেষ করে এমন সময়ে যখন তারা ২০৩০ সালের কমনওয়েলথ গেমস এবং ২০৩৬ সালের অলিম্পিক আয়োজনের দাবিদার হিসেবে নিজেদের তুলে ধরছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ভারতে পরীক্ষিত ৭,১১৩টি নমুনার মধ্যে ২৬০ জন ক্রীড়াবিদের ফলাফল পজিটিভ এসেছে। সংখ্যার বিচারে ভারতের পরেই রয়েছে ফ্রান্স, যেখানে ৯১টি পজিটিভ কেস নথিভুক্ত হয়েছে। ইতালিতে এই সংখ্যা ৮৫, আর রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রে সমান ৭৬টি করে। জার্মানি ও চীনও তালিকার উপরের দিকে রয়েছে।
এই পরিসংখ্যান ভারতের জন্য কেবল একটি প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ নয়; এটি দেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি এবং ভবিষ্যৎ অলিম্পিক পরিকল্পনার সঙ্গেও সরাসরি জড়িত। গত কয়েক বছর ধরে ভারত সরকার, গুজরাট রাজ্য প্রশাসন এবং ভারতীয় অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশন (IOA) মিলে এমন একটি প্রকল্প গড়ে তুলছে, যার কেন্দ্রবিন্দু আহমেদাবাদ এবং গুজরাট। পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য, এমন একটি অলিম্পিক ও প্যারালিম্পিক আয়োজন করা যা ভারতের ক্রীড়া ইতিহাসে নতুন অধ্যায় খুলে দেবে।
এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে সম্প্রতি ভারতীয় প্রতিনিধিদল সুইজারল্যান্ডের লোজানে আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটি (IOC)-এর সদর দপ্তর এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ক্রীড়া ফেডারেশনের কার্যালয় সফর করেছে। সফরটি ছিল নিছক আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার মধ্যে নিজেদের উপস্থিতি জোরালোভাবে জানান দেওয়ার একটি কৌশলগত পদক্ষেপ।
ভারতীয় প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন IOA-র সভাপতি পি. টি. উষা এবং গুজরাট সরকারের মন্ত্রী হর্ষ সঙ্ঘভি। অলিম্পিক হাউসে IOC কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকের পাশাপাশি তারা আন্তর্জাতিক বাস্কেটবল ফেডারেশন (FIBA), ওয়ার্ল্ড অ্যাকোয়াটিক্স, ওয়ার্ল্ড আর্চারি এবং আন্তর্জাতিক সাইক্লিং ইউনিয়নের (UCI) প্রতিনিধিদের সঙ্গেও আলোচনা করেন। আলোচনার মূল বিষয় ছিল ভারতের প্রস্তুতি, অবকাঠামো এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা।
গুজরাট প্রশাসনের দাবি, ক্রীড়া খাতে তাদের বিনিয়োগ এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রমাণ করে যে অঞ্চলটি অলিম্পিক আয়োজনের জন্য প্রস্তুত। প্রস্তাবিত প্রকল্পের কেন্দ্রে রয়েছে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ক্রিকেট স্টেডিয়াম নরেন্দ্র মোদী স্টেডিয়াম এবং তার আশপাশের এলাকা। সাবরমতী নদীর তীর ঘিরে একটি বিস্তৃত ক্রীড়া কমপ্লেক্স গড়ে তোলার পরিকল্পনাও রয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হবে বিদ্যমান অবকাঠামো এবং নতুন করে নির্মিত বিভিন্ন ভেন্যু।
ভারতীয় কর্তৃপক্ষ মনে করছে, ২০৩০ সালের কমনওয়েলথ গেমস আয়োজনের সুযোগ পেলে সেটি ২০৩৬ সালের অলিম্পিকের প্রস্তুতির জন্য একটি কার্যকর পরীক্ষাগার হিসেবে কাজ করবে। বড় আকারের বহুক্রীড়া প্রতিযোগিতা পরিচালনার অভিজ্ঞতা প্রকল্পটিকে আরও বাস্তবসম্মত এবং পরিণত করে তুলতে পারে।
তবে কেবল অবকাঠামোই যথেষ্ট নয়। আন্তর্জাতিক অলিম্পিক আন্দোলনের কাছে গ্রহণযোগ্যতা অর্জনের জন্য ভারতকে আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আস্থা তৈরি করতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে ক্রীড়াবিদদের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা, আঞ্চলিক রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যেও নিরাপদ পরিবেশ বজায় রাখা এবং অতীতের কিছু বিতর্কিত অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়া। বিশেষ করে ২০১০ সালের কমনওয়েলথ গেমসের সংগঠন নিয়ে যে সমালোচনা হয়েছিল, তার স্মৃতি এখনও পুরোপুরি মুছে যায়নি।
এর পাশাপাশি রয়েছে ক্রীড়া পারফরম্যান্সের প্রশ্ন। বিশ্বের বৃহত্তম জনসংখ্যার দেশ হওয়া সত্ত্বেও অলিম্পিকে ভারতের পদকসংখ্যা এখনও তুলনামূলকভাবে সীমিত। তাই কেবল গেমস আয়োজন নয়, উচ্চমানের ক্রীড়াবিদ তৈরির ক্ষেত্রেও দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের প্রয়োজনীয়তা ক্রমশ সামনে আসছে।
এই প্রেক্ষাপটে ডোপিং-সংক্রান্ত উদ্বেগ আরও বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। WADA-র প্রতিবেদন প্রকাশের পর ভারতের জাতীয় অ্যান্টি-ডোপিং সংস্থা (NADA) নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করে জানিয়েছে যে গত কয়েক বছরে তারা ডোপিংবিরোধী কাঠামো উল্লেখযোগ্যভাবে শক্তিশালী করেছে। সংস্থার দাবি, পরীক্ষার সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে এবং শিক্ষা ও সচেতনতা কার্যক্রমে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
NADA-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত বছরের শুরু থেকে মোট ৭,০৬৮টি পরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে এবং তাতে ১১০টি পজিটিভ কেস শনাক্ত হয়েছে। সংস্থাটি এই পরিসংখ্যানকে প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরছে যে তারা সমস্যাকে আড়াল না করে বরং আরও সক্রিয়ভাবে শনাক্ত করার চেষ্টা করছে।
তবু ঘটনাগুলো বিতর্ককে থামাতে পারেনি। ২০২৪ সালের প্যারিস অলিম্পিকে অংশ নেওয়া তরুণ কুস্তিগীর রীতিকা হুডা গত জুলাইয়ে ডোপ পরীক্ষায় পজিটিভ হওয়ার পর সাময়িকভাবে নিষিদ্ধ হন। কয়েক সপ্তাহ আগে ভারতীয় বিশ্ববিদ্যালয় গেমসেও এমন ঘটনা সামনে আসে, যেখানে কিছু অ্যাথলেটিক্স প্রতিযোগিতায় মাত্র একজন প্রতিযোগী অংশ নেন। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের দাবি, অ্যান্টি-ডোপিং কর্মকর্তাদের উপস্থিতির কারণে অন্য অনেকে প্রতিযোগিতায় নামতেই চাননি।
IOC-ও বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে। গত বছর ভারতীয় প্রতিনিধিদলকে স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছিল যে অলিম্পিক আয়োজনের সম্ভাবনা শক্তিশালী করতে হলে ডোপিংবিরোধী ব্যবস্থাকে আরও কঠোর ও কার্যকর করতে হবে। সেই পরামর্শের পর আগস্টেই একটি বিশেষ কমিশন গঠন করা হয় এবং পরে নতুন অ্যান্টি-ডোপিং আইনও পাস করা হয়। আইনের উদ্দেশ্য পরীক্ষার পরিধি বাড়ানো, সনাক্তকরণ সক্ষমতা উন্নত করা এবং নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করা।
ভারতের সামনে তাই এখন এক ধরনের দ্বৈত বাস্তবতা দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে তারা বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্রীড়া আসর নিজেদের মাটিতে আনার স্বপ্ন দেখছে, অন্যদিকে সেই স্বপ্নকে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে হলে ডোপিংয়ের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান সাফল্য দেখানোও জরুরি। লোজানের বৈঠকগুলোয় ভারতীয় প্রতিনিধিরা যে দৃঢ়তা দেখিয়েছেন, তা স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত দেয় যে তারা প্রতিযোগিতা থেকে সরে দাঁড়ানোর কথা ভাবছে না।
নতুন IOC সভাপতি কির্স্টি কভেন্ট্রির সঙ্গে সাম্প্রতিক আলোচনা সেই প্রচেষ্টারই অংশ। ভবিষ্যৎ আয়োজক নির্বাচন প্রক্রিয়া নিয়ে IOC নতুন করে ভাবতে শুরু করেছে, ফলে ২০৩৬ সালের দৌড়ে এখনও অনেক কিছু বদলে যেতে পারে। আন্তর্জাতিক প্রতিদ্বন্দ্বীরাও নিজেদের অবস্থান মজবুত করতে সক্রিয়।
তবু ভারতের বার্তাটি পরিষ্কার—তারা শুধু প্রার্থী হতে চায় না, জয়ীও হতে চায়। কিন্তু সেই পথ কতটা মসৃণ হবে, তা অনেকটাই নির্ভর করছে মাঠের ভেতরের সাফল্য এবং মাঠের বাইরের বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর।
More Stories
বিশ্বকাপের আগে দুই মেরুর সংকট: অনিশ্চয়তায় লিটন দাস, ভারতের প্রস্তুতিতেও বড় ফাঁক
তিলকের ঝোড়ো প্রত্যাবর্তনে বিশ্বকাপের আগে স্বস্তি ভারতীয় শিবিরে, অন্যদিকে জমে উঠল গ্রুপ পর্বের অঙ্ক