12 জুন 2026

ক্লিক, কোড এবং মানবিক স্পর্শ: প্রযুক্তির যুগে পর্যটনের ভোলবদল

কিছু শব্দ থাকে যা অন্য কোনো ভাষায় হুবহু অনুবাদ করা যায় না। জাপানি ‘ওমোতেনাশি’ (Omotenashi) তেমনই এক শব্দ। অনেকে একে সহজ কথায় ‘জাপানি আতিথেয়তা’ বলে চালিয়ে দেন, কিন্তু টোকিও-ভিত্তিক ঐতিহ্যবাহী পর্যটন সংস্থা জেটিবি (JTB)-র প্রধান এইজিরো ইয়ামাকিতা মনে করিয়ে দেন, এটি কোনো বাঁধা-ধরা নিয়ম বা ম্যানুয়াল মেনে চলে না। ওমোতেনাশি হলো সেবার পেছনের আসল মানসিকতা, একটা জীবনদর্শন। উল্টো দিকের মানুষটার মন পড়া, চারপাশের পরিবেশটা আঁচ করা এবং সেই অনুযায়ী নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার নামই ওমোতেনাশি।

মজার বিষয় হলো, এই ‘পরিস্থিতি আঁচ করা’র কাজটাই কিন্তু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI-ও খুব ভালো পারে—অবশ্য সম্পূর্ণ অন্যভাবে। AI পড়তে পারে ডেটা, মানুষের রেখে যাওয়া ডিজিটাল সংকেত আর তার ওপর ভিত্তি করে নিখুঁত অনুমান করতে পারে। তাই এআই আর ওমোতেনাশির সম্পর্কটা কোনো সংঘাতের রাস্তা নয়, বরং ভবিষ্যতের পর্যটন ব্যবসায় এটা অন্যতম এক আকর্ষণীয় পার্টনারশিপ হয়ে উঠতে চলেছে। ইয়ামাকিতা স্পষ্ট বিশ্বাস করেন, ট্রাভেলের আসল আনন্দ টিকিট বা হোটেল বুকিংয়ের মধ্যে কোনোদিনই ছিল না, আর থাকবেও না। রোবট সঙ্গী থেকে শুরু করে ব্যারি ডিলার, কিংবা সপ্তাহে দুদিনের কাজের সংস্কৃতির মতো বৈচিত্র্যময় বিষয় নিয়ে আলোচনা করার সময়েও তিনি বারবার ফিরে গিয়েছেন তাঁর মূল বিশ্বাসে—ভ্রমণের আসল মূল্য লুকিয়ে আছে মানুষের অভিজ্ঞতায়।

শিকড়ে ফেরা এবং অভিজ্ঞতার নতুন সমীকরণ

আজকের ডিজিটাল দুনিয়ায় একটা বড় প্রশ্ন উঠছে: AI যদি অনলাইন ট্রাভেল এজেন্সিগুলোর (OTA) সামনে বড়সড় অস্তিত্বের সংকট তৈরি করে, তবে জেটিবি-র মতো শতাব্দীপ্রাচীন সংস্থাগুলো কি একটু বেশি সুবিধাজনক অবস্থানে থাকবে? যারা যুগের পর যুগ ধরে মানুষের সাথে সরাসরি সম্পর্ক তৈরি করেছে, গন্তব্যের পরিকাঠামো গড়ে তুলেছে আর লজিস্টিকসের গভীরতা বোঝে? ইয়ামাকিতা কোনো দ্বিধা ছাড়াই এতে সম্মতি জানান। বুকিং বা তথ্যের আদান-প্রদান হয়তো স্ক্রিনের ওপার থেকে AI খুব সহজে সামলে দেবে, কিন্তু যখন আসল ভ্রমণের কথা আসে—মানুষ কীভাবে নতুন একটা দেশ বা সংস্কৃতিকে দেখবে—সেখানে রক্তমাংসের মানুষের ছোঁয়া অপরিহার্য। লজিস্টিকস বা যাতায়াতের ব্যবস্থা এখন কমোডিটাইজড বা সহজলভ্য হয়ে গেছে, যেকোনো অ্যাপেই তা সম্ভব। কিন্তু যেটা থেকে যায়, তা হলো অভিজ্ঞতার স্তর (experience layer)। ইন্টারনেট বা ওটিএ-র জমানা আসার আগে ডেস্টিনেশন ম্যানেজমেন্ট কোম্পানিগুলোই ছিল এই শিল্পের মূল চালিকাশক্তি, যেখানে লজিস্টিকসটাই ছিল আসল প্রোডাক্ট। আজ সেই লজিস্টিকসের খোলস ছেড়ে পর্যটন আবার তার পুরোনো শিকড়ে ফিরছে, যেখানে মানুষের অভিজ্ঞতাটাই শেষ কথা।

জেটিবি-র কৌশলগত লক্ষ্য ‘ওপেন ফ্রন্টিয়ার ২০৩৫’ এই পরিবর্তনের কথাই বলে। বর্তমানে তাদের আয়ের প্রায় ৮৬ শতাংশ আসে জাপান থেকে আর মাত্র ১৪ শতাংশ আসে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে। লক্ষ্য হলো ২০৩৫ সালের মধ্যে এই অনুপাতকে ৫০/৫০০ স্তরে নিয়ে যাওয়া। কিন্তু ওমোতেনাশির মতো একটি বিমূর্ত, ব্যক্তিগত অনুভূতিকে গ্লোবাল স্তরে নিয়ে যাওয়া কি এতই সহজ? ইয়ামাকিতা এখানে তিনটি স্তম্ভের কথা বলেন। প্রথমত, চেনা ছকের গ্রুপ ট্যুর বাদ দিয়ে কমিউনিটি ট্রাভেলের ওপর জোর দেওয়া। AI হয়তো ওয়ান-টু-ওয়ান যোগাযোগের ক্ষেত্রে দারুণ, কিন্তু দলগত মানসিকতার জটিলতা বোঝা বা মানুষের আবেগের ওঠা-পড়া সামলানোর ক্ষমতা কেবল মানুষেরই আছে। দ্বিতীয়ত, বড় বড় কনফারেন্স বা ইভেন্টে (MICE) এমন কিছু ‘পারফেক্ট মোমেন্ট’ বা নিখুঁত মুহূর্ত তৈরি করা যা মানুষকে ভেতর থেকে নাড়া দেবে। আর তৃতীয়ত, খেলাধুলা বা বিনোদনের মতো কনটেন্ট ও আইপি (IP)-র মাধ্যমে কোনো ডেস্টিনেশনকে আকর্ষণীয় করে তোলা, যার জন্য জেটিবি এখন ডেটা অ্যানালিটিক্স এবং স্টার্টআপ কোলাবোরেশনের পেছনে বিনিয়োগ করছে।

সমুদ্র সৈকত ছাড়িয়ে: শ্রীলঙ্কার বুকে স্লো ট্রাভেলের বাস্তবতা

লজিস্টিকসের ঊর্ধ্বে উঠে অভিজ্ঞতার এই যে গভীরতা, তার একটা বাস্তব রূপ দেখা যাচ্ছে শ্রীলঙ্কার দক্ষিণ উপকূলে, শাংরি-লা হাম্বানটোটা (Shangri-La Hambantota)-র ১৪৫ একরের বিস্তীর্ণ চত্বরে। শহরের চেনা বিলাসবহুল রিসোর্টের চেয়ে এটি সম্পূর্ণ আলাদা। ট্রপিক্যাল বাগান, লেগুন, বন্যপ্রাণী আর ভারত মহাসাগরের মেলবন্ধনে এখানে তৈরি হয়েছে এক মন্থর, শান্ত ভ্রমণের পরিবেশ, যাকে আমরা ‘স্লো ট্রাভেল’ বলতে পারি।

আজকের পর্যটকরা শুধু ছবি তোলার জন্য ঘর ছাড়েন না, তারা খোঁজেন এক গভীর অর্থপূর্ণ অবকাশ। হাম্বানটোটা আজ শুধু সমুদ্রসৈকতে বসে অলস সময় কাটানোর জায়গা নয়; গলফ ট্যুরিজম, ওয়েলনেস রিট্রিট, ডেস্টিনেশন ওয়েডিং থেকে শুরু করে বন্যপ্রাণীর মুখোমুখি হওয়া—সবকিছুর মধ্য দিয়ে স্থানীয় সংস্কৃতি ও প্রকৃতির সাথে জুড়ে যাওয়ার এক মাধ্যম। রিসোর্টের জেনারেল ম্যানেজার রেফহান রাজীনের ফোকাসও ঠিক এই জায়গাটিতে—দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম সেরা লিজার ডেস্টিনেশন হিসেবে এটিকে তুলে ধরা, যেখানে মানুষ প্রকৃতির সাথে একাত্ম হতে পারবে।

চেনা ছকের বাইরে মুক্তির অবকাশ

এই বিশাল উন্মুক্ত প্রান্তর মানুষের মনের গতিকেও শান্ত করে দেয়। প্রতিদিনের চেনা রুটিন থেকে মুক্তি পেয়ে পর্যটকরা এখানে আসেন স্রেফ বিশ্রামের জন্য বা নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করতে। বিশেষ করে প্রতিবেশী দেশ ভারত থেকে আসা পর্যটকদের কাছে এই ধরনের দীর্ঘমেয়াদি এবং উদযাপনমূলক ট্রাভেলের চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। তারা শুধু সমুদ্র দেখতে আসেন না, আসেন গলফ খেলতে, প্রকৃতির কাছাকাছি থাকতে কিংবা স্থানীয় কারিগরদের সাথে সময় কাটাতে। হাম্বানটোটার চারপাশের বুন্দালা বা ইয়ালা ন্যাশনাল পার্কের পরিবেশ পর্যটকদের আত্মবিশ্লেষণের সুযোগ করে দেয়।

প্রযুক্তির নিখুঁত ডেটা আর মানুষের মনের ভেতরের ওমোতেনাশি বা মন্থর ভ্রমণের এই যে তৃষ্ণা—এরাই আসলে ভবিষ্যতের পর্যটনকে নিয়ন্ত্রণ করছে। একদিকে এআই যখন নিখুঁত লজিস্টিকস সাজিয়ে দিচ্ছে, অন্যদিকে মানুষ খুঁজছে হাম্বানটোটার মতো প্রকৃতির কোলে একটু বুক ভরে নিঃশ্বাস নেওয়ার জায়গা, যেখানে গতি সাময়িকভাবে থমকে যায়। ট্রাভেলের ভবিষ্যৎ তাই কোনো স্ক্রিনে আটকে নেই, তা ছড়িয়ে আছে মানুষের অনুভূতি আর প্রকৃতির নিস্তব্ধতার গভীরে।