22 জুন 2026

ভবিষ্যতের শিক্ষার ব্লুপ্রিন্ট: স্টেম (STEM) সিম্পোজিয়াম থেকে সিবিএসই-র মূল্যায়নে যুগান্তকারী বদল

শিক্ষার আসল উদ্দেশ্য তো শুধু সিলেবাস শেষ করা বা বই মুখস্থ করা নয়, বরং আগামী দিনের উদ্ভাবকদের তৈরি করা। ঠিক এই ভাবনা নিয়েই গত ১৭ ও ১৮ জুন, ২০২৬ তারিখে চায়না সুং চিং লিং সায়েন্স অ্যান্ড কালচার সেন্টার ফর ইয়াং পিপল-এ আয়োজিত হলো ইয়ুথ সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট এডুকেশন সিম্পোজিয়াম। প্রায় ৩০০ জন বিশেষজ্ঞ, শিক্ষাবিদ এবং গবেষক এক ছাদের তলায় এসেছিলেন। লক্ষ্য একটাই—কীভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) এই যুগে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি শিক্ষাকে ঢেলে সাজানো যায়।

প্যানেল ডিসকাশনগুলো বেশ জমজমাট ছিল। মূল আলোচনা ঘুরেফিরে তিনটে বিষয়ের ওপরই ছিল: এআই-এর যুগে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি শিক্ষার খোলনলচে বদলানো, একদম সেরা মানের উদ্ভাবনী প্রতিভা গড়ে তোলা এবং আন্তর্জাতিক স্তরে যুব বিজ্ঞান শিক্ষার তুলনামূলক বিশ্লেষণ। বাচ্চারা তো আর কারখানার রোবট নয় যে সবাইকে এক ছাঁচে গড়তে হবে! তাই বিশেষজ্ঞরা জোর দিলেন পার্সোনালাইজড টিচিং বা ব্যক্তিগত পর্যায়ে শেখানোর পদ্ধতির ওপর, যাতে প্রত্যেক পড়ুয়া নিজের জন্য একদম সঠিক রাস্তাটা বেছে নিতে পারে। পাশাপাশি, বিজ্ঞান-ভিত্তিক পড়াশোনা কীভাবে ছোট থেকেই বাচ্চাদের মধ্যে কল্পনাশক্তি আর সায়েন্টিফিক লিটারেসি বাড়াতে পারে, তা নিয়েও বিস্তর আলোচনা হয়।

সেন্টারের ডিরেক্টর গুও জিনবাও একটা খুব দামি কথা তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে, বিজ্ঞান শিক্ষাকে শুধু ল্যাবরেটরির চার দেওয়ালে আটকে রাখলে চলবে না। বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, শিল্পকলা, সংস্কৃতি এবং খেলাধুলা—সব কিছু মিলিয়ে একটা সামগ্রিক পাঠক্রম বা হোলিস্টিক ফ্রেমওয়ার্ক তৈরি করাটা এখন সময়ের দাবি। তিনি স্পষ্ট বলেন, “আমরা বিজ্ঞান ও সংস্কৃতির এই রসদগুলোকে এক সুতোয় বাঁধতে বদ্ধপরিকর। পড়ুয়াদের বয়স আর তাদের চাহিদার কথা মাথায় রেখে এমন একটা লার্নিং পাথওয়ে তৈরি করা হচ্ছে, যেখানে তারা নান্দনিকতা, শরীরচর্চা আর বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার মধ্যে দিয়ে নিজেদের একটা শক্ত ভিত গড়তে পারবে।” সিম্পোজিয়ামের প্রদর্শনীতেও ইনোভেশন ল্যাব তৈরি বা আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার মতো নানা উদ্যোগের কথা তুলে ধরা হয়।

এই যে একটা ন্যাশনাল-লেভেল প্ল্যাটফর্ম তৈরি করে বাচ্চাদের বিজ্ঞানমনস্ক করে তোলার চেষ্টা, এটা তো শুধু একটা দেশের ব্যাপার নয়, পুরো বিশ্বের শিক্ষাব্যবস্থাতেই এই হাওয়া লেগেছে। কিন্তু এই বড় বড় থিওরি বা ভিশনের পাশাপাশি আমাদের মাটিতে দাঁড়িয়ে বাস্তবটাও দেখতে হবে। পরিকাঠামো বা সিলেবাস যত ভালোই হোক না কেন, পরীক্ষার খাতায় সঠিক মূল্যায়ন না হলে আর সিস্টেমের ওপর ছাত্রছাত্রীদের ভরসা না থাকলে সব চেষ্টাই জলে যায়। আর ঠিক এখানেই সেন্ট্রাল বোর্ড অফ সেকেন্ডারি এডুকেশন (CBSE) একটা দারুণ খবর দিয়েছে, যা ভারতীয় শিক্ষাব্যবস্থায় একটা বড় পদক্ষেপ।

টাইমস নাও-এর একটি সাম্প্রতিক রিপোর্ট অনুযায়ী, সিবিএসই তাদের খাতা দেখা এবং পুনর্মূল্যায়ন (revaluation) প্রক্রিয়ায় একটা বড়সড় বদল এনেছে। এতদিন নিয়ম ছিল, খাতা ভেরিফিকেশন বা রিভ্যালুয়েশনের পর যদি রেজাল্টে ‘নো-চেঞ্জ’ (No-Change) আসত, তাহলে পড়ুয়াদের সেটা একরকম মেনেই নিতে হতো। নিজের খাতা চোখে দেখার কোনও সুযোগ ছিল না। কিন্তু এখন থেকে সেই নিয়মে ইতি। ভেরিফিকেশনের পরেও যদি কোনও পড়ুয়া তার ফলাফল নিয়ে ধন্দে থাকে, তবে সে সরাসরি সিবিএসই-র রিজিওনাল অফিসে গিয়ে নিজের মূল্যায়ন করা উত্তরপত্র (evaluated answer book) নিজের হাতে নিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে পারবে। বোর্ডের ইতিহাসে স্বচ্ছতা আনার জন্য এমন ফিজিক্যাল ইন্সপেকশনের সুযোগ এই প্রথমবার দেওয়া হলো।

অনেক সময়েই খাতা দেখার পদ্ধতি নিয়ে নানারকম অভিযোগ ওঠে, একটা চাপা ক্ষোভ তৈরি হয়। ফিজিক্যাল ইন্সপেকশনের সুযোগ সেই ক্ষোভে অনেকটাই প্রলেপ দেবে। বোর্ড কীভাবে এই গোটা প্রক্রিয়াটা চালাবে, তার বিস্তারিত গাইডলাইন এখনও আসা বাকি থাকলেও, পোস্ট-রেজাল্ট গ্রিভান্স মেকানিজম বা অভিযোগ নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে এটা একটা মাস্টারস্ট্রোক। ইতিমধ্যেই ২১ জুন, ২০২৬-এ বোর্ড জানিয়েছে যে, রেজাল্ট বেরোনোর পর ভেরিফিকেশন বা রিভ্যালুয়েশনের জন্য জমা পড়া আবেদনের ৮৭ শতাংশেরও বেশি প্রথম দফাতেই মিটিয়ে ফেলা হয়েছে। ছাত্রছাত্রীরা চাইলে এখনই বোর্ডের অফিশিয়াল পোর্টালে লগ-ইন করে তাদের আপডেট করা নম্বর আর স্ট্যাটাস দেখে নিতে পারে।

একদিকে যখন আন্তর্জাতিক স্তরে কীভাবে আরও ভালো উদ্ভাবক তৈরি করা যায় তা নিয়ে ব্রেনস্টর্মিং চলছে, তখন অন্যদিকে নিজেদের ঘরের মাঠে অন্তত মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনার এই উদ্যোগটা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। দিনের শেষে, একটা মজবুত শিক্ষাব্যবস্থা তো শুধু প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করে না, তা টিকে থাকে ভরসা আর স্বাধীন চিন্তার ওপর।