২০২৫ সালটা ইতালির ট্রাভেল মার্কেটের জন্য একটা বেশ বড়সড় মাইলফলক হয়েই থাকল। ফোকাসরাইট (Phocuswright)-এর সাম্প্রতিক একটা রিপোর্ট অন্তত সে কথাই বলছে। পরিসংখ্যান ঘাঁটলে দেখা যাচ্ছে, গত বছর তাদের গ্রস বুকিংয়ের অঙ্কটা গিয়ে ঠেকেছে চোখধাঁধানো ৩০ বিলিয়ন ইউরোতে। আগের বছরের তুলনায় এই বৃদ্ধিটা প্রায় ৪.৫ শতাংশ। বার্সেলোনায় অনুষ্ঠিত ফোকাসরাইট ইউরোপ কনফারেন্সের ঠিক আগেই এই রিপোর্টটা প্রকাশ্যে আসে। একটা ব্যাপার খুব পরিষ্কার—মার্কেটে চাহিদার কোনো ঘাটতি নেই, আর ডিজিটাল মাধ্যমগুলো ইতালির পর্যটন ব্যবসার মানচিত্রটাকে একেবারে খোলনলচে বদলে দিচ্ছে।
বিদেশি পর্যটকদের ভিড় এবং বদলে যাওয়া হিসেবনিকেশ
হিসেব বলছে, ২০২৫ সালে পর্যটকদের রাত কাটানোর (overnight stays) সংখ্যা ছিল ৪৭৬ মিলিয়ন, যা আগের বছরের চেয়ে প্রায় ১ কোটি বেশি। কিন্তু শুধু এই ওভারঅল সংখ্যাটা দেখলে আসল ছবিটা পরিষ্কার হবে না। এর ভেতরে একটা বেশ ইন্টারেস্টিং ডাইনামিক্স কাজ করছে।
ফোকাসরাইট-এর ম্যানেজিং ডিরেক্টর পিট কোমো-র ভাষায় বলতে গেলে, “৪৭৬ মিলিয়ন স্টে-টা একটা রেকর্ড ঠিকই, তবে আসল চমকটা লুকিয়ে আছে এই গ্রোথটা কোথা থেকে আসছে তার ওপর।” ঘটনা হলো, ইতালির নিজস্ব মানুষজন মানে ডোমেস্টিক ট্রাভেলারদের ঘোরাঘুরির গ্রাফটা প্রায় একই জায়গায় থমকে আছে। এই যে বাজারের এত রমরমা, এর পুরোটাই কিন্তু বিদেশি পর্যটকদের দৌলতে। আর বুকিংয়ের ধরনটাও এখন অনেকটাই প্রযুক্তি-নির্ভর হয়ে পড়েছে। মোট বুকিংয়ের ৫৮ শতাংশই হচ্ছে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে, যেখানে স্মার্টফোনের মাধ্যমে বুকিংয়ের আধিপত্যটাই সবচেয়ে বেশি।
সস্তার উড়ান আর ছোট শহরের কানেক্টিভিটি
উড়ান পরিষেবার ছবিটাও গত কয়েক বছরে বেশ পাল্টে গেছে। সস্তার উড়ান বা লো-কস্ট ক্যারিয়ারগুলোর (LCC) দাপট এখন এতটাই যে, ২০২৫ সালের গ্রীষ্মে মোট এভিয়েশন ক্যাপাসিটির ৬১ শতাংশই ছিল এদের দখলে। ২০১৯ সালের দিকে তাকালে দেখা যাবে এই সংখ্যাটা ছিল ৪৮ শতাংশ। এই পরিবর্তনের একটা বড় ইমপ্যাক্ট পড়েছে ইতালির ট্যুরিজমে। এখন শুধু রোম, ভেনিস বা মিলানের মতো গতে বাঁধা বড় শহর নয়, ইতালির ছোটখাটো বা সেকেন্ডারি শহরগুলোতেও বিদেশিদের যাতায়াত অনেক সহজ হয়ে গেছে। আর এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে ইনবাউন্ড ট্যুরিজমের গ্রাফে।
পাশাপাশি রেলভ্রমণও কিন্তু পিছিয়ে নেই। ট্রেনে গ্রস বুকিংয়ের পরিমাণ পৌঁছেছে ৪.৩ বিলিয়ন ইউরোতে। ট্রেন সফরের ক্ষেত্রে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো, অনলাইনে টিকিট কাটার প্রবণতা হু হু করে বেড়ে ৬৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। মানুষ এখন আর স্টেশনে গিয়ে লাইন দেওয়ার চেয়ে অ্যাপে টিকিট কাটাতেই বেশি স্বচ্ছন্দ।
হোটেল ব্যবসায় বিপুল লগ্নি
এত লোক যখন বাইরের দেশ থেকে আসছে, তখন তাদের থাকার জন্য উন্নত মানের জায়গাও দরকার। গ্রস বুকিংয়ের দিক থেকে একোমোডেশন বা হোটেল সেক্টর এখনো মার্কেট লিডার। শুধু ২০২৫ সালেই হোটেলের রুম রেভিনিউ ছুঁয়েছে ১৯.১ বিলিয়ন ইউরো। স্বাভাবিকভাবেই, বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও এই সুযোগটা হাতছাড়া করতে চাইছেন না। আড়াই বিলিয়ন ইউরোর বেশি লগ্নি এসেছে হোটেল ব্যবসায়। এই লগ্নিকারীদের নজরে শুধু বড় বড় গেটওয়ে সিটিগুলোই নেই, বরং নতুন করে গজিয়ে ওঠা লাক্সারি ডেস্টিনেশনগুলোও এখন রিয়েল এস্টেট ইনভেস্টমেন্টের হটকেক হয়ে উঠেছে।
সব মিলিয়ে ইতালির ট্রাভেল সেক্টরের এই জোয়ার ইউরোপের সামগ্রিক অর্থনীতির জন্যই বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। আগামী ২০২৬ সালের ফোকাসরাইট ইউরোপ সম্মেলনে এই বিষয়গুলো নিয়ে আরও বিস্তারিত কাঁটাছেঁড়া হবে। ইউরোপের পর্যটন বাজারের ভবিষ্যৎ ঠিক কোন খাতে বইবে এবং এই বিপুল ডিজিটাল অ্যাডপশন কীভাবে বাকি দেশগুলোকে প্রভাবিত করবে, ইন্ডাস্ট্রির মাথারা সেখানে বসেই হয়তো তার একটা নতুন রূপরেখা তৈরি করবেন।
More Stories
ক্লিক, কোড এবং মানবিক স্পর্শ: প্রযুক্তির যুগে পর্যটনের ভোলবদল
২০২৬ সালের গ্রীষ্মকালীন ভ্রমণে নিউ ইয়র্কের অবস্থান এবং আকাশছোঁয়া খরচ বাঁচানোর কার্যকরী উপায়
এশিয়ায় ভ্রমণে বাড়তি খরচ ও ভোগান্তি: ধকল সামলে যেভাবে সতেজ রাখবেন ত্বক