19 জুন 2026

বিটকয়েনের দাম ৬৩,০০০ ডলারের গুরুত্বপূর্ণ সাপোর্টের নিচে — কেন এটি আরও কমতে পারে এবং এর মূল বিষয়গুলো

ফেডারেল রিজার্ভের কড়া নীতির কারণে বিটকয়েন তার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ টেকনিক্যাল সাপোর্ট লেভেলের নিচে নেমে গেছে। অনেক বিশ্লেষকই সতর্ক করছেন যে বাজারের এই দরপতন হয়তো এখানেই শেষ নয়, যদিও দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগকারীরা (যাদের বুল বলা হয়) সাময়িক এই দুর্বলতা সত্ত্বেও নিজেদের অবস্থানে বেশ আত্মবিশ্বাসী।

গত বৃহস্পতিবার বিটকয়েনের দাম ৬৩,০০০ ডলারের নিচে নেমে যায়। মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা কিছুটা কমলেও মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভের ‘হকিশ’ বা কঠোর অবস্থানের কারণে বাজারে এক ধরনের আতঙ্ক তৈরি হয়েছিল। এই পতনের মূল ধাক্কাটা আসে ফেড চেয়ারম্যান কেভিন ওয়ার্শের একটি পলিসি আপডেটের পর, যা বাজারের প্রত্যাশার চেয়ে অনেক বেশি আগ্রাসী ছিল। নীতিনির্ধারকরা বেঞ্চমার্ক সুদের হার ৩.৫০% থেকে ৩.৭৫% এর মধ্যেই অপরিবর্তিত রেখেছেন ঠিকই, কিন্তু তাদের নতুন পূর্বাভাসে দীর্ঘ সময়ের জন্য চড়া সুদের হার বজায় রাখার স্পষ্ট ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। এর মানে হলো, ভবিষ্যতে সুদ কমার যে আশা বাজার করছিল, তাতে রীতিমতো জল ঢেলে দেওয়া হয়েছে। ওয়ার্শ আরও পরিষ্কার করে দিয়েছেন যে কেন্দ্রীয় ব্যাংক আগের মতো আগাম কোনো ধারণা বা ‘ফরওয়ার্ড গাইডেন্স’ দেওয়ার পথ থেকে সরে আসবে। স্বাভাবিকভাবেই, এই অনিশ্চয়তা বিনিয়োগকারীদের বুক কাঁপিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল।

কয়েনমার্কেটক্যাপের বিশ্লেষণ বলছে, ফেডের এই অবস্থানের কারণে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদ থেকে হাত গোটাতে শুরু করে। প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ের বিক্রি এবং লেভারেজড মার্কেটের অস্থিরতা এই পতনকে আরও তরান্বিত করেছে। ১৭ জুনের হিসেব অনুযায়ী, স্পট বিটকয়েন ইটিএফ থেকে ৮২.২ মিলিয়ন ডলারের বেশি মূলধন বেরিয়ে গেছে। আর এই ডাম্পের মধ্যে প্রায় ১৩০ মিলিয়ন ডলার মূল্যের বুলিশ বিটকয়েন পজিশন লিকুইডেট বা শূন্য হয়ে গেছে। ৬৩,১৭৩ ডলারের কাছাকাছি যে ৭৮.৬% ফিবোনাচি রিট্রেসমেন্ট লেভেল ছিল, সেটা ভেঙে যাওয়ার পর বাজার এখন আরও বেশি দুর্বল। বিশ্লেষকদের মতে, পরবর্তী বড় সাপোর্ট জোনটা ৬০,০০০ থেকে ৬২,০০০ ডলারের মধ্যে। যদি এই জোনটা টিকে যায়, তবে হয়তো ৬৪,০০০ ডলারের দিকে একটা বাউন্স ব্যাক দেখা যেতে পারে। কিন্তু যদি এই লেভেলটাও ভাঙে, তবে দাম ৫৫,০০০ ডলারের দিকে আছড়ে পড়ার প্রবল ঝুঁকি রয়েছে, বিশেষ করে ইটিএফ থেকে যদি এভাবে ফান্ড বের হতে থাকে।

বাজারের তলানি কি আসলেই এসে গেছে? ক্রিপ্টো মার্কেট মেকার উইন্টারমিউট বিনিয়োগকারীদের আরেকটু বাস্তববাদী হওয়ার পরামর্শ দিচ্ছে। তাদের মতে, বাজারে সাময়িক একটা স্বস্তি দেখা দিলেও এর মানে এই নয় যে বিটকয়েন তার বটম বা তলানিতে পৌঁছে গেছে। এটা সত্যি যে মূল্যস্ফীতির কিছুটা নরম ডেটা এবং মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি শান্ত হওয়ায় বিটকয়েন ৬০,০০০ ডলারের কাছাকাছি থেকে কিছুটা রিকভার করেছিল। কিন্তু বাজারের ভেতরের অবস্থা এখনও বেশ নড়বড়ে। উইন্টারমিউট পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছে, বাজার একটু ঘুরে দাঁড়ানো মানেই সব ঠিক হয়ে যাওয়া নয়। একটা টেকসই রিকভারি আসার আগে বিটকয়েনের দাম আরও অনেকটা নিচে নামার সম্ভাবনা তারা একেবারেই উড়িয়ে দিচ্ছে না। পরিস্থিতি ভালো হওয়ার আগে বিটকয়েন ৫০ হাজার ডলারের ঘরেও ট্রেড হতে পারে।

ফেডের পলিসি বনাম বিটকয়েনের সীমাবদ্ধ সাপ্লাই ফেডারেল রিজার্ভের এই সুদ হারের খেলা বা সরকারি মুদ্রার এই অনিশ্চয়তার বিপরীতেই আসলে বিটকয়েনের মূল শক্তি লুকিয়ে আছে। বিটকয়েনের সর্বোচ্চ সাপ্লাই ২১ মিলিয়ন বা ২.১ কোটি কয়েনে সীমাবদ্ধ। এর স্রষ্টা, ছদ্মনামধারী সাতোশি নাকামোতো নেটওয়ার্কের কোডেই এই লিমিট হার্ড-কোড করে দিয়েছেন। সরকারি মুদ্রার মতো কোনো কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষ চাইলেই ইচ্ছামতো নতুন বিটকয়েন ছাপাতে পারবে না, বা এর সাপ্লাই শিডিউলে হাত দিতে পারবে না। ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে রিলিজ হওয়া অরিজিনাল সফটওয়্যার থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত এই নিয়মের কোনো নড়চড় হয়নি। এই ২১ মিলিয়ন সংখ্যাটা কিন্তু এলোপাতাড়ি বেছে নেওয়া হয়নি, এটি একটি গাণিতিক ফর্মুলার যোগফল।

নতুন বিটকয়েন বাজারে আসে শুধুমাত্র ‘মাইনিং’ এর মাধ্যমে। এটি এমন একটি প্রক্রিয়া যেখানে শক্তিশালী কম্পিউটারগুলো বিটকয়েন ব্লকচেইনে লেনদেনের নতুন ব্লক যোগ করার জন্য প্রতিযোগিতায় নামে। নেটওয়ার্কের প্রুফ-অফ-ওয়ার্ক অ্যালগরিদম সমাধান করে যে মাইনার সবার আগে সঠিক ব্লক তৈরি করতে পারে, প্রোটোকল তাকে পুরষ্কার হিসেবে নতুন বিটকয়েন দেয়। এই ব্লক রিওয়ার্ডই হলো নতুন বিটকয়েন তৈরির একমাত্র উৎস। শুরুর দিকে মাইনাররা প্রতি ব্লকের জন্য ৫০টি করে বিটকয়েন পেত। কিন্তু প্রায় প্রতি চার বছর পর পর এই পুরষ্কার অর্ধেক হয়ে যায়, যাকে ‘হলভিং’ বলা হয়। ২০২৮ সালের এপ্রিলের দিকে পরবর্তী হলভিং হওয়ার কথা, তখন ব্লক রিওয়ার্ড কমে মাত্র ১.৫৬২৫ বিটকয়েনে দাঁড়াবে।

২০২৬ সালের শুরুর দিক পর্যন্ত মোট সাপ্লাইয়ের ৯৫ শতাংশেরও বেশি মাইনিং করা হয়ে গেছে। এমনকি ২০২৬ সালের মার্চ মাসে ২০ মিলিয়নতম বিটকয়েনটিও মাইন করা সম্পন্ন হয়েছে। এর মানে হলো, আর মাত্র ১০ লাখেরও কম বিটকয়েন তৈরি হওয়া বাকি। ব্লক রিওয়ার্ড যেহেতু নির্দিষ্ট সময় পরপর অর্ধেক হয়ে যাচ্ছে, তাই এই বাকি বিটকয়েনগুলো বাজারে আসতে আগের চেয়ে অনেক বেশি সময় লাগবে। পরের এক দশকে নয়, বরং এই অবশিষ্ট সাপ্লাই বাজারে আসতে সময় লাগবে প্রায় এক শতাব্দী। ধারণা করা হয়, ২১৪০ সালের দিকে সর্বশেষ ভগ্নাংশ বিটকয়েনটি মাইন করা হবে।

২১ মিলিয়ন পূর্ণ হওয়ার পর নেটওয়ার্কের কী হবে? অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে, যখন সব বিটকয়েন মাইন করা হয়ে যাবে, তখন কি পুরো সিস্টেম বসে যাবে? মোটেও না। শেষ বিটকয়েনটি তৈরি হওয়ার পর মূল পরিবর্তন আসবে শুধু মাইনারদের আয়ের মডেলে। তখন আর কোনো নতুন কয়েন ইস্যু হবে না, প্রোটোকল এমন যেকোনো ব্লক বাতিল করে দেবে যা নতুন কয়েন তৈরির চেষ্টা করবে। ২১ মিলিয়নের লিমিট চিরস্থায়ীভাবে লক হয়ে যাবে। কিন্তু ব্লকচেইন আগের মতোই কাজ করবে, লেনদেন কনফার্ম হবে এবং নেটওয়ার্কের ফুল নোডগুলো প্রোটোকলের সব নিয়ম একইভাবে মেনে চলবে। মাইনাররা তখন আর নতুন বিটকয়েন পাবে না ঠিকই, তবে ব্যবহারকারীরা যে লেনদেন ফি দেবে, সেটাই হবে তাদের আয়ের একমাত্র উৎস। সাপ্লাই শেষ হয়ে যাওয়া মানে বিটকয়েন নেটওয়ার্কের সমাপ্তি নয়, বরং এটি তার চূড়ান্ত অর্থনৈতিক পরিণতিতে গিয়ে পৌঁছানো।