19 মে 2026

পরীক্ষার মরসুম: উচ্চমাধ্যমিকের প্রশাসনিক কড়াকড়ি এবং আইআইটি-র প্রবেশিকা যুদ্ধের চালচিত্র

সংসদের কঠোর অবস্থান ও প্রশাসনিক প্রস্তুতি

বোর্ডের চূড়ান্ত সেমিস্টার একেবারে দোরগোড়ায়। পরীক্ষা ব্যবস্থা যাতে পুরোপুরি নিশ্ছিদ্র থাকে, সেই লক্ষ্যে উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা সংসদ এবার রীতিমতো কড়া পদক্ষেপ নিয়েছে। পরিষ্কার জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, পরীক্ষা চলাকালীন শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীদের সব ধরনের ছুটি বাতিল। কেউ গুরুতর অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হলে বা খুব বড় কোনও জরুরি পরিস্থিতি তৈরি হলেই কেবল ছাড় মিলবে। প্রায় ৭ লক্ষ পরীক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ যেখানে জড়িয়ে, সেখানে প্রশাসনে কোনও ঢিলেমি বরদাস্ত করতে রাজি নয় কর্তৃপক্ষ।

তবে মানবিক দিকটাও একেবারে এড়িয়ে যাওয়া হয়নি। ধরুন, কোনও পরীক্ষার্থীর বাবা-মা দু’জনেই শিক্ষকতা বা স্কুলের অন্যান্য কাজের সঙ্গে যুক্ত; সে ক্ষেত্রে তাদের মধ্যে অন্তত একজন ছুটি পাবেন। আবার স্বার্থের সংঘাত এড়াতে আরও একটি নিয়ম করা হয়েছে—যে স্কুলে শিক্ষার্থীর সিট পড়েছে, সেখানে যদি তার অভিভাবক কর্মরত থাকেন, তবে তিনি কোনওভাবেই সেই পরীক্ষার ডিউটিতে থাকতে পারবেন না।

বোর্ডের গণ্ডি ছাড়িয়ে আইআইটি-র স্বপ্ন

বোর্ডের এই কড়াকড়ির মধ্যেই বিজ্ঞান শাখার পড়ুয়াদের জন্য আরও এক বড় চ্যালেঞ্জ সদ্যই পার হল। দেশের প্রথম সারির ইঞ্জিনিয়ারিং প্রতিষ্ঠান অর্থাৎ আইআইটি-তে (IIT) ভর্তির ছাড়পত্র আদায় করার সেই মেগা ইভেন্ট—জয়েন্ট এন্ট্রান্স অ্যাডভান্সড (JEE Advanced)। আইআইটি রুরকি-র পরিচালনায় সম্প্রতি এই পরীক্ষাটি সম্পন্ন হয়েছে। পড়ুয়া ও বিশেষজ্ঞদের প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া বলছে, এবারের প্রশ্নপত্র মোটেও সহজ ছিল না; বরং বেশ কিছু ক্ষেত্রে পরীক্ষার্থীদের রীতিমতো ঘাম ছুটিয়ে দিয়েছে।

সকালের শিফটে হওয়া প্রথম পত্রটি বেশ চ্যালেঞ্জিং ছিল। গণিতের অংশটি ছিল দীর্ঘ এবং কঠিন, পদার্থবিদ্যায় দরকার ছিল ধারণার একেবারে শিকড় পর্যন্ত পৌঁছানোর ক্ষমতা, আর রসায়নের প্রশ্নগুলো ছিল বেশ গোলমেলে। দুপুরের দ্বিতীয় পত্রের চিত্রটাও খুব একটা আলাদা নয়। এটিও ছিল অত্যন্ত ধারণানির্ভর এবং সময়সাপেক্ষ। বিশেষ করে গণিতের প্রশ্নগুলো সমাধান করতে গিয়ে পরীক্ষার্থীদের রীতিমতো নাভিশ্বাস উঠেছে। স্বাভাবিকভাবেই, প্রশ্নপত্রের এই কঠিন ধরন সরাসরি প্রভাব ফেলতে চলেছে এবারের কাট-অফ নম্বরে।

কাট-অফের পরিসংখ্যান ও সম্ভাব্য চিত্র

আইআইটি-র মতো প্রতিষ্ঠানে জায়গা করে নিতে গেলে একটি ন্যূনতম নম্বর বা কাট-অফ পার করা বাধ্যতামূলক। প্রতি বছর প্রশ্নপত্রের কাঠিন্য, পরীক্ষার্থীর সংখ্যা এবং শূন্যপদের ওপর ভিত্তি করে এই নম্বর বদলায়। এবার বিখ্যাত কোচিং প্রতিষ্ঠান অ্যালেন (Allen) এবং ফিজিক্স ওয়ালা (Physics Wallah)-র মতো সংস্থাগুলো নিজেদের মতো করে সম্ভাব্য কাট-অফের একটা খসড়া তৈরি করেছে। অ্যালেন যেখানে ন্যূনতম প্রয়োজনীয় নম্বরের শতাংশের ওপর জোর দিচ্ছে, সেখানে ফিজিক্স ওয়ালা দেখছে পার্সেন্টাইল বা প্রতিযোগীদের তুলনায় আপেক্ষিক অবস্থান।

ক্যাটাগরি অ্যালেন – ন্যূনতম মোট নম্বর (%) ফিজিক্স ওয়ালা – সম্ভাব্য পার্সেন্টাইল
সাধারণ (General) ২০.৬০% ৯৩.২ – ৯৪.১
ওবিসি-এনসিএল (OBC-NCL) ১৮.৫০% ৭৯ – ৮০
সাধারণ-ইডব্লিউএস (GEN-EWS) ১৮.৫০% ৮১ – ৮২
এসসি (SC) ১০.৩০% ৬০ – ৬২
এসটি (ST) ১০.৩০% ৪৭ – ৪৯
বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন (PwD) ১০.৩০% ০.০০১ – ১

পরিসংখ্যানের আড়ালের গল্প সাধারণ ক্যাটাগরির জন্য অ্যালেন যেখানে মাত্র ২০.৬ শতাংশ নম্বরকে ন্যূনতম হিসেবে ধরছে, সেখানে ফিজিক্স ওয়ালার মতে কাট-অফ পার্সেন্টাইল গিয়ে ঠেকতে পারে ৯৩ থেকে ৯৪-এর ঘরে। এর থেকেই স্পষ্ট যে ওপরের দিকের র‍্যাঙ্কগুলো দখল করার লড়াইটা ঠিক কতটা হাড্ডাহাড্ডি। GEN-EWS এবং OBC-NCL-এর ক্ষেত্রে কিছুটা ছাড় দেখা যাচ্ছে; অ্যালেন উভয়ের জন্যই ১৮.৫ শতাংশের কথা বলছে, আর ফিজিক্স ওয়ালার মতে পার্সেন্টাইল ৭৯ থেকে ৮২-র আশেপাশে ঘোরাফেরা করবে।

অন্যদিকে, এসসি (SC) এবং এসটি (ST) ক্যাটাগরিতে অ্যালেনের হিসাব ১০.৩ শতাংশে স্থির থাকলেও ফিজিক্স ওয়ালার পার্সেন্টাইল রেঞ্জ বেশ ওপরের দিকে (এসসি-র জন্য ৬০-৬২ এবং এসটি-র জন্য ৪৭-৪৯)। এটা একটা ইতিবাচক ইঙ্গিত দেয় যে এই পিছিয়ে পড়া অংশগুলোর পরীক্ষার্থীরা আগের চেয়ে অনেক ভালো ফল করছে। আর বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন (PwD) পরীক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে অ্যালেনের ১০.৩ শতাংশের বিপরীতে ফিজিক্স ওয়ালার প্রায় শূন্যের কাছাকাছি পার্সেন্টাইলের হিসাবটা একটা অদ্ভুত বৈপরীত্য তৈরি করেছে, যা পুরো পরীক্ষা প্রক্রিয়ার নিজস্ব জটিলতাকেই তুলে ধরে। শিক্ষাব্যবস্থার এই দুই ভিন্ন মেরু—বোর্ডের শৃঙ্খলা আর জয়েন্টের তীব্র প্রতিযোগিতা—এটাই এখন লাখো শিক্ষার্থীর প্রতিদিনের বাস্তব।