15 জুন 2026

শিক্ষার অসমাপ্ত লড়াই: পরিকাঠামো, সংস্কার এবং বাস্তবতার টানাপোড়েন

আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার শেকড়ে বেশ কিছু গাঠনিক এবং পদ্ধতিগত গলদ রয়ে গেছে, যা আজও অমীমাংসিত। সর্বশিক্ষা অভিযান বা শিক্ষার অধিকার আইন (২০০৯)-এর মতো উদ্যোগ এবং সম্প্রতি জাতীয় শিক্ষানীতি (NEP 2020) খাতা-কলমে ছাত্রভর্তির হার বা এনরোলমেন্ট হয়তো বাড়িয়েছে, কিন্তু গুণগত মান, সমতা এবং প্রাসঙ্গিকতার নিরিখে আমরা এখনও অনেকটা অন্ধকারে হাতড়ে বেড়াচ্ছি। দেশের ৬৯ শতাংশ স্কুলই সরকারি এবং মোট পড়ুয়ার অর্ধেকই এই স্কুলগুলোর ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু এই বিপুল আয়তনের খোলসটুকু বাদ দিলে, পরিকাঠামোর অভাব, শিক্ষকের আকাল এবং মুখস্থবিদ্যা-সর্বস্ব একঘেয়ে সিলেবাস গোটা ব্যবস্থাকেই ভেতর থেকে পঙ্গু করে রাখছে। শিক্ষায় সরকারি ব্যয় জিডিপির মাত্র ৪.১ থেকে ৪.৬ শতাংশের মধ্যেই ঘুরপাক খায়, যা NEP-এর প্রস্তাবিত ৬ শতাংশের লক্ষ্যের ধারেকাছেও নেই। আশ্চর্যের বিষয় হলো, অতীতের কোনো সরকারই এই লক্ষ্যমাত্রা ছুঁতে পারেনি।

প্রাথমিক স্তরে এনরোলমেন্ট প্রায় একশো শতাংশ হলেও, ক্লাসের সিঁড়ি ভাঙার সাথে সাথে ছবিটা বেশ হতাশাজনক হতে শুরু করে। পড়ুয়াদের মাঝপথে স্কুল ছাড়ার (ড্রপআউট) প্রবণতা আজও এক গভীর উদ্বেগের কারণ। নবম শ্রেণিতে পা রাখা পড়ুয়াদের মধ্যে মাত্র অর্ধেক শেষমেশ দ্বাদশ শ্রেণির গণ্ডি পেরোতে পারে, আর প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি হওয়া বাচ্চাদের এক-তৃতীয়াংশ নবম শ্রেণি পর্যন্ত পৌঁছানোর আগেই পড়াশোনায় ইতি টানে। এর নেপথ্যে রয়েছে দারিদ্র্য, পরিযায়ী জীবন, বাল্যবিবাহ বা নিছকই পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলা।

ASER ২০২৪-এর রিপোর্ট আমাদের এই ‘শিক্ষাহীন স্কুলিং’-এর এক নগ্ন বাস্তব তুলে ধরেছে। পঞ্চম শ্রেণির প্রায় ৪৯ শতাংশ পড়ুয়া দ্বিতীয় শ্রেণির বই সাবলীলভাবে পড়তে হোঁচট খায়, আর ভাগ অঙ্কের মতো সাধারণ অঙ্ক কষতে পারে মাত্র ৩১ শতাংশ। এই দুর্গতির অন্যতম কারণ হলো আমাদের ‘ওয়ান-সাইজ-ফিটস-অল’ ধাঁচের শিক্ষাপদ্ধতি। একটা বাচ্চা কীসে দক্ষ, তার নিজস্ব চিন্তাভাবনা বা সৃজনশীলতা কী—সেসবের তোয়াক্কা না করে তাকে পাঠ্যবইয়ের বোঝায় চাপা দেওয়া হয়। প্র্যাক্টিকাল স্কিল বা রিয়েল-ওয়ার্ল্ড প্রবলেম সলভিংয়ের বদলে জোর দেওয়া হয় মুখস্থবিদ্যার ওপর। সবাইকে একইভাবে জয়েন্ট এন্ট্রান্স (JEE) বা নিট (NEET)-এর ইঁদুর দৌড়ে নামিয়ে দেওয়া হয়, যার অবশ্যম্ভাবী পরিণতি হলো চূড়ান্ত মানসিক চাপ, হতাশা এবং ভুল কেরিয়ার বেছে নেওয়া।

এই পরীক্ষাকেন্দ্রিক চাপ কমানোর একটা মরিয়া চেষ্টা হিসেবেই সেন্ট্রাল বোর্ড অফ সেকেন্ডারি এডুকেশন (CBSE) ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে দশম শ্রেণির পড়ুয়াদের জন্য বছরে দু’বার বোর্ড পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। জাতীয় শিক্ষানীতির প্রস্তাবনা মেনেই এই সংস্কার। নতুন নিয়মে, পড়ুয়ারা একই শিক্ষাবর্ষে দু’বার পরীক্ষায় বসার সুযোগ পাবে—প্রথমটি ফেব্রুয়ারিতে এবং পরেরটি বছরের অন্য কোনো সময়ে। প্রথম পরীক্ষায় কেউ যদি নিজের নম্বরে সন্তুষ্ট না হয় বা কোনো বিষয়ে ফেল করে, তবে সে দ্বিতীয় পরীক্ষায় বসতে পারবে এবং দুটোর মধ্যে সেরা নম্বরটাই চূড়ান্ত বলে গ্রাহ্য হবে। অসুস্থতা বা অন্য কোনো কারণে প্রথম পরীক্ষায় খারাপ ফল হলে এই দ্বিতীয় সুযোগটা পড়ুয়াদের কাছে একটা লাইফলাইন হতে পারে।

তবে প্রশ্ন থেকেই যায়, দ্বিতীয়বারও যদি কেউ পাশ করতে না পারে, তখন কী হবে? বোর্ডের প্রস্তাবিত নিয়ম বলছে, দ্বিতীয় সুযোগেও ব্যর্থ হলে সেই পড়ুয়াকে ওই শিক্ষাবর্ষের জন্য অনুত্তীর্ণ বা আনসাকসেসফুল ধরা হবে এবং পরের বছর তাকে আবার আগের নিয়মেই পরীক্ষায় বসতে হবে। পরীক্ষার চাপ কমানোর এই দাওয়াই সাময়িকভাবে স্বস্তি দিলেও, এতে শিক্ষার গুণগত মানের কোনো আসল পরিবর্তন হবে কি না, তা নিয়ে ধন্দ থেকেই যায়।

পাঠ্যবইয়ের পাতার দিকে তাকালেও সেই আশা খুব একটা জাগে না। সম্প্রতি পাঠ্যবইয়ের যে পরিমার্জন হয়েছে, তাতে ভারতের বৈচিত্র্যময় আঞ্চলিক, ভাষাগত এবং সংখ্যালঘু দৃষ্টিভঙ্গিকে কার্যত কোণঠাসা করে একটি নির্দিষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠের বয়ান চাপিয়ে দেওয়ার প্রবণতা স্পষ্ট। এই তথাকথিত ‘ভারতীয় দৃষ্টিভঙ্গি’ অনেক ক্ষেত্রেই গৈরিকীকরণের (saffronisation) দিকে ঝুঁকছে, যা সমাজের প্রান্তিক শ্রেণির পড়ুয়াদের কাছে এক ধরনের সাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতা তৈরি করছে। বহুত্ববাদ বা প্লুরালিজমের বদলে এটি সমাজে বিভেদই বাড়াবে। এর পাশাপাশি, ত্রিভাষা সূত্র চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা তামিলনাড়ু, কর্ণাটক বা কেরালার মতো অহিন্দিভাষী রাজ্যগুলোতে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। জাতীয় সংহতির নামে এই ভাষাগত আগ্রাসন কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে টানাপোড়েন আরও বাড়াচ্ছে।

উচ্চশিক্ষার আঙিনায় পা রাখলে হতাশার চিত্রটা আরও প্রকট হয়ে ওঠে। হাতে গোনা কয়েকটি এলিট প্রতিষ্ঠানে ফান্ডের বন্যা বয়ে গেলেও, সাধারণ রাজ্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলো চরম অর্থাভাবে রীতিমতো ধুঁকছে। গবেষণার (R&D) খাতে ভারতের বিনিয়োগ জিডিপির মাত্র ০.৬৪-০.৭ শতাংশেই আটকে আছে এবং জাতীয় গবেষণায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবদান মাত্র ৮-৯ শতাংশ। এর বিপরীতে, দক্ষিণ কোরিয়া (৪.৮%), ইজরায়েল (৫.৪%), আমেরিকা (২.৮%) বা চীনের (২.১%) মতো দেশগুলো গবেষণায় বিপুল বিনিয়োগ করে চলেছে।

আমাদের গবেষণার সংখ্যা হয়তো বাড়ছে, কিন্তু মানের দিক থেকে তা তলানিতেই রয়ে গেছে। মেধাপাচার (ব্রেন ড্রেন) অব্যাহত, আর ন্যাশনাল রিসার্চ ফাউন্ডেশন টাকার অভাবে কার্যত নিষ্প্রভ। সুপ্রিম কোর্টের রায়ের ওপর ভর করে পরীক্ষাব্যবস্থার যে অতি-কেন্দ্রীকরণ হয়েছে, তা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নিজস্বতা এবং ফেডারেল কাঠামোকে ধ্বংস করছে। প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো কেলেঙ্কারি তো এখন নৈমিত্তিক ঘটনা। যতক্ষণ না স্কুলগুলো পড়ুয়া-কেন্দ্রিক হয়ে উঠছে এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তাদের হারানো স্বায়ত্তশাসন ও বৈচিত্র্য ফিরে পাচ্ছে, ভারতের শিক্ষাব্যবস্থা উদ্ভাবন এবং সামাজিক উত্তরণের এই অসমাপ্ত লড়াইয়ে হোঁচট খেতেই থাকবে।